সীমান্তে একযোগে বিএসএফের পুশ-ইন অপচেষ্টা

শূন্যরেখায় নারী-শিশুসহ আটকে বহু মানুষ, কঠোর অবস্থানে বিজিবি

Sadek Ali
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৬:৪৭ অপরাহ্ন, ০৬ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৮:৩২ অপরাহ্ন, ০৬ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর ধারাবাহিক ‘পুশ-ইন’ অপচেষ্টা। পঞ্চগড়, মেহেরপুর, লালমনিরহাট, নওগাঁ, নেত্রকোনা, ঝিনাইদহ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় গত কয়েক দিনে নারী-শিশুসহ বহু মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। 

শনিবার সকালে বিজিব দপ্তর থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় দেশের এলাকায় ভারতীয় বিএসএফ প্রচেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।  

আরও পড়ুন: জাবির উপ-উপাচার্য পদে ড. নজরুল ইসলাম ও ড. শামছুল আলম

বিজিবির দাবি, এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, বিদ্যমান আইন এবং বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা লঙ্ঘিত হয়েছে। বাহিনীটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যথাযথ কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কোনো ধরনের পুশ-ইন গ্রহণ করা হবে না।

পঞ্চগড়ে ৩৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে শূন্যরেখায় ১০ জন: 

আরও পড়ুন: যমুনা সেতু মহাসড়কে ১৭ কিলোমিটার যানজট, চরম দুর্ভোগে হাজারো যাত্রী

পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে বিএসএফের পুশ-ইনের চেষ্টার মুখে নারী-শিশুসহ ১০ জন ব্যক্তি শুক্রবার ভোর থেকে শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ, দুইজন নারী ও তিনজন শিশু রয়েছে।

প্রায় দেড় দিনেরও বেশি সময় ধরে তারা খোলা আকাশের নিচে ফসলি জমির আলে অবস্থান করছেন। শুক্রবার রাতের বজ্রবৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও তাদের সেখানে থাকতে হয়েছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে একাধিক পতাকা বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি।

নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিএসএফ দাবি করছে ওই ব্যক্তিরা বাংলাদেশের নাগরিক। তবে দাবির পক্ষে তারা কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দেখাতে পারেনি। বিজিবি স্পষ্ট জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট (আইসিপি) ব্যবস্থার মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ফেরত পাঠানো হলে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে, কিন্তু রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পেরিয়ে কাউকে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

মেহেরপুরেও ব্যর্থ পুশ-ইন: 

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়ীয়া সীমান্তে আরও ছয়জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীর প্রতিরোধের মুখে ওই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

বর্তমানে তিন পুরুষ, দুই নারী ও এক শিশুসহ ছয়জন শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। বিষয়টি নিয়ে পতাকা বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি।

বিভিন্ন সীমান্তে অন্তত আটটি অপচেষ্টা প্রতিহত: 

বিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের অন্তত আটটি পৃথক পুশ-ইন অপচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে।

এর মধ্যে—ঝিনাইদহের যাদবপুর সীমান্তে ৩ জন, নওগাঁর করমুডাঙ্গা সীমান্তে ১৭ জন,লালমনিরহাটের বড়খাতা ও পঁয়ষট্টিবাড়ী সীমান্তে ২১ জন, দিঘলটারী সীমান্তে ৭ জন, দুর্গাপুর সীমান্তে ৪ জন, পঞ্চগড়ের বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তে ১০ জন, নেত্রকোনার সীমান্ত এলাকায় ১৬ থেকে ১৭ জনকে জড়ো করার তথ্য পাওয়া গেছে।

সব মিলিয়ে অন্তত ৭৮ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা হয়েছে বলে সীমান্ত সূত্রে ধারণা করা হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৮ জনকে সরিয়ে নেয় বিএসএফ: 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে দুই দিন ধরে অবস্থান করা ২৮ জনকে শনিবার আর শূন্যরেখায় দেখা যায়নি।

বিজিবির ধারণা, নিজেদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ায় শুক্রবার গভীর রাতে বিএসএফ তাদের ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়েছে। এর আগে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি।

মানবিক সংকট নাকি পরিকল্পিত চাপ?

সীমান্ত পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় একই ধরনের ঘটনা ঘটায় বিষয়টি বিচ্ছিন্ন নয় বরং একটি সমন্বিত প্রবণতা হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

শূন্যরেখায় আটকে পড়া নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের মানবিক দুর্ভোগ উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। বৃষ্টি, খাদ্যসংকট ও নিরাপত্তাহীন পরিবেশে তাদের অবস্থান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?

আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় প্রথা অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠাতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে যোগাযোগ, পরিচয় যাচাই এবং নির্ধারিত সীমান্ত চেকপোস্ট ব্যবহারের বিধান রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিচয় যাচাই ছাড়াই সীমান্ত দিয়ে লোকজনকে ঠেলে দেওয়া হলে তা আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার নীতি এবং দুই দেশের বিদ্যমান সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কাঠামোর পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কূটনৈতিক বার্তা স্পষ্ট করল বিজিবি: 

বিজিবি সদর দপ্তর দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে, সীমান্ত দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। দেশের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

একই সঙ্গে সীমান্তে উদ্ভূত পরিস্থিতি এখন শুধু নিরাপত্তা ইস্যু নয়, বরং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সংবেদনশীল কূটনৈতিক প্রশ্ন হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে চলমান ঘটনাগুলোর দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য সমাধানে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।