ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে-উত্তেজনা

সীমান্তে নতুন করে পুশইন-পুশব্যাক ইস্যু

Sadek Ali
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৭:৫৪ অপরাহ্ন, ০৬ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৯:২৭ অপরাহ্ন, ০৬ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

# একদিনে ৮টি পুশইন প্রতিহত, সীমান্তে কঠোর অবস্থানে বিজিবি

# নওগাঁর সীমান্তে শিশুসহ ১৭ জনকে জোরপূর্বক পুশইন করেছে বিএসএফ

আরও পড়ুন: এরদোগানকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) জোরপূর্বক বাংলাদেশি বা অন্য কোনো দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে তাদের অপচেষ্ঠা রুখে দিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠাচ্ছে। এতে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিরাজ করছে উদ্বেগ-উত্তেজনা। বিশেষ করে যশোর, চাপাইনবাবগঞ্জ ও লালমনিরহাট সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে পূর্বনির্ধারিত আগামী ৮ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ঝিনাইদহ, যশোর, লালমনিরহাট, নওগাঁ এবং জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন সীমান্তে বিএসএফ পুশইনের বেশ কয়েকটি বড় ধরনের চেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি। সাধারণত গভীর রাতে প্রিজন ভ্যান বা পিকআপে করে লোকজনকে শূন্যরেখায় এনে কাঁটাতারের গেট খুলে দিয়ে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা চালায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বিজিবি ও স্থানীয় জনতা কড়া প্রতিরোধ গড়ে তোলার কারণে বিএসএফ সেই ব্যক্তিদের পুনরায় ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এরইমধ্যে বিজিবি জানিয়েছে, বৈধ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ছাড়া দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার পরিপন্থী কোনো পুশইনই গ্রহণযোগ্য নয়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিবি সীমান্ত জুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি এবং টহল কার্যক্রম সর্বোচ্চ সতর্কতায় রেখেছে। 

আরও পড়ুন: অবর্ণনীয় দুর্ভোগে ঢাকায় ফিরছে কর্মজীবী মানুষ

সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক অবৈধভাবে ‘পুশইনে’র ৮টি পৃথক প্রচেষ্টা সফলভাবে প্রতিহত করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। একই সঙ্গে সীমান্তে পুশইন প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাহিনীটি। শনিবার বিজিবির সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঝিনাইদহের মহেশপুর ব্যাটালিয়নের (৫৮ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ যাদবপুর সীমান্তে ৩ জন ব্যক্তি ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিজিবি টহলদল সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান নিয়ে তাদের বাধা দেয়। বিজিবির দৃঢ় অবস্থানের মুখে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়ে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরে যায়। নওগাঁ ব্যাটালিয়নের (১৬ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ করমুডাঙ্গা সীমান্ত এলাকায় ১৭ জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। বিজিবি টহলদল তাৎক্ষণিকভাবে তাদের প্রতিহত করে। তিস্তা ব্যাটালিয়নের (৬১ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ বড়খাতা ও পঁয়ষট্টিবাড়ী সীমান্ত এলাকায় ২১ জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করা হলে বিজিবির তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ফলে তারা সীমান্ত অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়। লালমনিরহাট ব্যাটালিয়নের (১৫ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ দিঘলটারী সীমান্ত এলাকায় ৭ জন ব্যক্তিকে পুশইনের চেষ্টা করা হলে বিজিবি দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের প্রবেশে বাধা দেয়। একই ব্যাটালিয়নের দুর্গাপুর সীমান্ত এলাকায় আরও ৪ জন ব্যক্তিকে পুশইনের চেষ্টা করা হলে বিজিবি তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বর্তমানে এসব ব্যক্তি ভারতীয় ভূখণ্ডের কাঁটাতারবিহীন চর এলাকায় অবস্থান করছে এবং বিজিবি সেখানে নিবিড় নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। নীলফামারী ব্যাটালিয়নের (৫৬ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ পঞ্চগড়ের বড়বাড়ী প্রধানপাড়া সীমান্ত এলাকায় ১০ জন ব্যক্তিকে কাঁটাতারের বাইরে এনে রাখা হয়। এ বিষয়ে বিজিবি–বিএসএফের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি করলেও তাদের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। বিষয়টি বিজিবি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এ ছাড়া নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নের (৩১ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ কচুগড়া সীমান্তের বিপরীতে ভারতের আসাম রাজ্যের মহাদেব থানাধীন বলিশী গিতারাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পূর্বে জড়ো করে রাখা ১৬–১৭ জন ব্যক্তিকে বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে সেখান থেকে সরিয়ে লেংগুড়া সীমান্তের বিপরীতে বিএসএফের চিকনী ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিজিবি ওই এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বিজিবি দ্ব্যর্থহীনভাবে পুনর্ব্যক্ত করছে যে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন এবং বাংলাদেশ–ভারত দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার পরিপন্থী কোনো ধরনের পুশইন প্রচেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। সীমান্ত দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।  দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সর্বদা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এরআগে নওগাঁর সাপাহার উপজেলার কলমুডাঙ্গা সীমান্তে গভীর রাতে শিশুসহ ১৭ জনকে জোরপূর্বক পুশইন (অনুপ্রবেশ) করিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ২৩৭ নম্বর মেইন পিলারের চকচকির বিল এলাকা দিয়ে তাদের পুশইন করা হয়।  শুক্রবার ভোরে অনুপ্রবেশকারীরা লোকালয়ে চলে এলে বিজিবি তাদের উদ্ধার করে ভারতের অভ্যন্তরে ফেরত পাঠানোর (পুশব্যাক) উদ্যোগ নেয়। তবে এতে বিএসএফ বাধা দেওয়ায় বর্তমানে পুশইনের শিকার ব্যক্তিরা জিরো লাইনে অবস্থান করছেন। উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ওই এলাকায় মুখোমুখি অবস্থানে আছেন। 

নওগাঁ ১৬ বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, ওইদিন গভীর রাতে ভারতীয় বিএসএফ জোয়ানরা তাদের দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের আটক করে সাপাহার সীমান্তের ওই এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। রাতেই তারা বোরো ধান ক্ষেতের মধ্য দিয়ে প্রায় ৭ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে শুক্রবার ভোরে সাপাহারের কলমুডাঙ্গা চৌমহোনী এলাকায় বাজারে এসে বিশ্রাম নেয়। ভোরে এলাকার লোকজন তাদের দেখে পুশইনের ঘটনা শুনে স্থানীয় কলমুডাঙ্গ বিওপি ক্যাম্পে সংবাদ দেয়। সংবাদ পেয়ে বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাদের পুশব্যাক করার উদ্দেশে ২৩৭ পিলার এলাকায় তাদের নিয়ে যায়। ইতোমধ্যেই ভারতীয় বিএসএফ সদস্যরা ঘটাস্থলে এসে বিজিবি সদস্যদের পুশব্যক প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়। বর্তমানে ঘটনাস্থলে বাংলাদেশের পক্ষে বিজিবি ও ভারতের পক্ষে বিএসএফ সদস্যরা মুখোমুখি অবস্থান করছেন। নওগাঁ ১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, সংবাদ পাওয়ার পরে ওই এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে। অবৈধভাবে বাংলাদেশে কাউকে অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম বলেন, অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে দেওয়া হয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পযর্বেক্ষণ করা হচ্ছে। যে কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

যশোরের ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সাইফুল ইসলাম খান বলেন, সারারাত সীমান্তে পূর্ণ শক্তিতে টহল রাখা হয়েছিল। বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে বিএসএফ সাদিপুর খড়ক্ষেত এলাকায় ১৯/এস-৬ সীমান্ত স্তম্ভের কাছে ঐ ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ঠেলে ঢোকাতে পারেনি। তাদের বর্তমানে জিরো লাইনে আটকে রাখা হয়েছে। বিষয়টির সমাধানের জন্য বিএসএফকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।