অবর্ণনীয় দুর্ভোগে ঢাকায় ফিরছে কর্মজীবী মানুষ
# ঝুম বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায়,স্থবির নগরজীবন
# ১২ ঘণ্টার জ্যাম ঠেলে ঢাকায় নেমে বাসায় যাওয়ার আরেক বিড়ম্বনা
আরও পড়ুন: শিশু নির্যাতন বন্ধে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন জরুরি: ডেপুটি স্পিকার
ঈদুল আজহার ছুটির পর জীবিকার তাগিদে নগরে চরম ভোগান্তিতে ফিরছে অসংখ্য কর্মজীবী ও শ্রমজীবী মানুষ। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে নৌ-রেল ও সড়কপথে তীব্র ভিড়, ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ও প্রচণ্ড গরমের কারণে শেষ মুহুর্তে যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। কারণ গতকাল শনিবার থেকে খুলেছে পোশাক কারখানাসহ দেশের বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এরইমধ্যে কর্মস্থলে যোগ দিতে শেষ মুহূর্তে গত শুক্রবার অনেক রাত পর্যন্ত রাজধানী ঢাকায় ফিরেছেন অসংখ্য শ্রমজীবী ও কর্মজীবী মানুষ। প্রতিবারের মতো এবারও দূরপাল্লার বাসের টিকিট সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, মহাসড়কের তীব্র যানজট এবং গভীর রাতে ঢাকায় নেমে বাসাবাড়িতে পৌঁছানোর জন্য যানবাহনের তীব্র সংকটে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। তবে বিকালের ঝুম বৃষ্টিতে নগরের বেশিরভাগ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে নগরজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
এদিকে, শনিবার বিকালের ঝুম বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে নগরজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। ভারী বর্ষণে সড়ক, অলিগলি ও নিম্নাঞ্চলে পানি জমে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে নগরজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। ভোরের আগেই শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে সড়ক, অলিগলি ও নিম্নাঞ্চলে পানি জমে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। এদিন যাত্রাবাড়ি-সায়েদাবাদ, শনির আখড়া, শান্তিনগর, মালিবাগ,পুরান ঢাকা, বংশাল, নাজিমুদ্দিন রোড, ধানমন্ডি, মিরপুর-১৩, হাতিরঝিল, আগারগাঁও-জাহাঙ্গীর গেট সড়ক, খামারবাড়ি-ফার্মগেট এলাকা, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড, মোহাম্মদপুর, মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট, ইসিবি ও কালশীসহ বহু এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। কোথাও পানি নামতে শুরু করলেও অধিকাংশ সড়কে যান চলাচল ধীরগতির থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগছে। তবে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রচণ্ড গরম থাকলেও বিকালের বৃষ্টির কারণে গণপরিবহনের উপস্থিতি কম ছিল। চলাচলকারী যানবাহনগুলোকে পানির মধ্যে ধীরগতিতে চলতে হওয়ায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। অনেকেই বিকল্প হিসেবে হেঁটে বা রিকশায় গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। যাত্রাবাড়ির শনিবর আখড়া এলাকার এক সিএনজিচালক আবুল হোসেন জানান, দিনভর রৌদ্র থাকলেও বিকালে বৃষ্টির কারণে যাত্রীসংখ্যা কমে গেছে এবং সড়কে পানি জমে থাকায় গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী স্বপন মিয়া বলেন, জলাবদ্ধতার কারণে অফিস শেষে বাসায় ফেরা কঠিন হয়ে গেছে এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ বাইরে বের হচ্ছেন না। দমকা বাতাসে ছাতা ব্যবহার করেও অনেক পথচারী ভিজে পড়েন। বিভিন্ন স্থানে রিকশার সংকট দেখা গেছে, পাশাপাশি বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। গতকাল শনিবার রাজধানীতে বিকেলের বৃষ্টি ও ঝড়ে সড়ক তলিয়ে যাওয়া, তীব্র যানজট এবং গণপরিবহন সংকটের কারণে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। পানি জমে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে গাড়ি চলাচল স্থবির হয়ে যায় এবং পথচারী ও অফিস ফেরত যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। তবে ঝুম বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন ঢাকার পথচারীরা। ঝুম বৃষ্টির কারণে সড়কে জলজটের পাশাপাশি শুরু হয় যানজট। এতে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। এদিন ফুটপাথের ব্যবসায়ীরা নিজের দোকান গুটিয়ে অপেক্ষা করেন। অনেকে ভিজতে থাকেন। তবে রাজধানীর পুরানা পল্টনে সরেজমিনে দেখা যায়, ফল ব্যবসায়ীসহ ফুটপাথে বসা ছোট ছোট বিক্রেতারা বিপাকে পড়েছেন। উন্মুক্ত স্থানে বিক্রি করা ফলসহ অন্যান্য পণ্য পলিথিন বা ত্রিফলা দিয়ে ঢেলে ফেললেও অনেকে ক্ষতির মুখে পড়েন। অনেকে ভিজে যান। বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে অনেক পথচারী অফিসের বারান্দা, বিপণিবিতানে আশ্রয় নিলেও অনেক রিকশাচালক বৃষ্টিতে ভিজে জবজমে হয়ে যান। এরআগে শুক্রবার রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী ও কল্যাণপুরসহ বিভিন্ন প্রবেশমুখ ঘুরে দেখা যায়, ব্যাগ-বস্তা আর লাগেজ হাতে অসংখ্য মানুষ মধ্যরাতেও বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন কিংবা বাস থেকে নেমে গন্তব্যে যাওয়ার বাহন খুঁজছেন। কিন্তু সেই তুলনায় রাস্তায় রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা অন্যান্য গণপরিবহন ছিল খুবই সীমিত। রাজধানীর পল্লবী এলাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন নুরুন নাহার। ঈদুল আজহায় টানা ১০ দিনের ছুটি পেয়ে তিনি গত ২৬ মে সিরাজগঞ্জে তার গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। ওইদিন দুপুর ১২টার দিকে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হতে সিরাজগঞ্জ শহরে আসেন। কিন্তু দুই ঘণ্টা ঘুরেও কোনো টিকিট পাচ্ছিলেন না। নুরুন নাহার বলেন, অতিরিক্ত ২০০ টাকা বাস ভাড়া বেশি ভাড়া দিছি। কিন্তু রাস্তায় জ্যামে ঢাকা আসতে ১২ ঘণ্টা লাগছে। ঢাকায় যখন নামলাম রাত দেড়টায়। তিনি জানান, মধ্যরাতে ঢাকায় নেমেও তিনি পড়েন আরেক বিপত্তিতে। রাস্তায় শত শত মানুষ ব্যাগ-লাগেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাসাবাড়িতে পৌঁছানোর মতো গাড়ি তেমন ছিল না। তার ভাষায়, ১২ ঘণ্টার জ্যাম ঠেলে ঢাকায় নেমে বাসায় যাওয়ার গাড়ি পাই না। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান বরিশাল সদর থেকে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী জহিরুল আলম। ৫০০ টাকার নিয়মিত বাস টিকিট অনেক কষ্টে বাড়তি ৩০০ টাকা যোগ করে ৮০০ টাকায় কিনতে হয়েছে তাকে। তিনি জানান, দক্ষিণবঙ্গের রাস্তায় যানজট তেমন না থাকলেও ঢাকায় ঢোকার মুখে দীর্ঘ যানজটে পড়তে হয়। সায়েদাবাদে বাস থেকে নেমে মিরপুরের বাসায় যাওয়ার জন্য কোনো গাড়ি পাচ্ছিলেন না তিনি। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে কয়েকজন মিলে একটি গাড়ি ভাড়া করে (শেয়ারিংয়ে) তাকে বাসায় ফিরতে হয়েছে। ভোগান্তির এই চিত্র থেকে বাদ যাননি শিক্ষার্থীরাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের আবাসিক ছাত্র আব্দুল মোমেন তার ছোট ভাইকে নিয়ে সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। বাসের টিকিট পেতে হন্যে হয়ে ঘোরার পর অবশেষে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এক হাজার টাকা বাড়তি দিয়ে রংপুর থেকে ছেড়ে আসা একটি এসি বাসে ওঠেন তিনি। আব্দুল মোমেন বলেন, ঢাকায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ২টা বেজে যায়। এত রাতে হলের গেট বন্ধ থাকবে ভেবে মিরপুর-১৪ নম্বরে বড় ভাইয়ের বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু রাস্তায় এসে দেখি আমাদের মতোই অসংখ্য মানুষ গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে আছেন, কোনো যানবাহন নেই।
আরও পড়ুন: নাগরিকদের জন্য ‘দক্ষিণের জানালা’ খুললো ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন
এদিকে সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তির বিপরীতে ঈদের এই ফিরতি সময়টাকে বাড়তি উপার্জনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন অনেকে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দিনের বদলে অনেক চালক এখন রাতে সিএনজি ও রিকশা চালাচ্ছেন। গভীর রাতে রাজধানীর শেওড়াপাড়া এলাকায় কথা হয় সিএনজিচালক আক্কাস আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, সাধারণত তিনি দিনে গাড়ি চালালেও গত ৩-৪ দিন ধরে রাতেই সিএনজি বের করছেন। আক্কাস আলীর ভাষায়, ঈদের ছুটি শেষে লোকজন রাতে বেশি ঢাকায় ফিরছে। এই সময়ে ট্রিপ মারলে ভালোই বাড়তি আয় করা যাচ্ছে। তবে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকায় ফেরায় এবং মহাসড়কে গাড়ির চাপ থাকায় এই যানজট তৈরি হয়েছে।





