ডেঙ্গু জ্বর-প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

Sanchoy Biswas
ডাঃ আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী
প্রকাশিত: ১০:৩৬ অপরাহ্ন, ০১ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১১:৪১ অপরাহ্ন, ০১ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে ডেঙ্গু আর শুধুমাত্র একটি মৌসুমি রোগের নাম নয়; এটি এখন একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকটের প্রতীক। এক সময় যে রোগকে মূলত রাজধানী ঢাকার সমস্যা বলে মনে করা হতো, গত কয়েক বছরে তা দেশের প্রত্যন্ত জেলা, উপজেলা এমনকি গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থির পানির আধিক্য এবং জনসচেতনতার ঘাটতি—সবকিছু মিলিয়ে ডেঙ্গু আজ বাংলাদেশের জন্য এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে ২০২৩ সাল বাংলাদেশের ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী সে বছর দেশে ৩ লক্ষ ২১ হাজারেরও বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং ১,৭০৫ জনের মৃত্যু ঘটে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। পরবর্তী বছর ২০২৪ সালেও ১ লক্ষের বেশি মানুষ আক্রান্ত হন এবং পাঁচ শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি; বরং ডেঙ্গু ধীরে ধীরে সারা বছরের রোগে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

আরও পড়ুন: গ্রামে ঈদ এবং কোরবানির চামড়া

ডেঙ্গু ভাইরাসবাহিত একটি সংক্রামক রোগ, যা মূলত এডিস (Aedes aegypti ও Aedes albopictus) মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। সাধারণ জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও গিঁটে তীব্র যন্ত্রণা, বমি, ত্বকে লালচে দাগ ইত্যাদি এর সাধারণ উপসর্গ। তবে সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এটি ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার (DHF) বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে (DSS) রূপ নিয়ে প্রাণঘাতী হতে পারে।

ডেঙ্গু মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধ। কারণ এখনও ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। তাই এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, বাসা-বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, ফুলের টব, এসির ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা কিংবা যেকোনো পাত্রে পানি জমতে না দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি মশারি ব্যবহার, মশা নিরোধক ব্যবহার, পূর্ণহাতা পোশাক পরিধান এবং কমিউনিটি পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।

আরও পড়ুন: শহীদ জিয়া: একটি জাতির আলোকবর্তিকা

ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, প্রচুর তরল খাবার গ্রহণ এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা শুধুমাত্র প্লাটিলেট সংখ্যা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা, রক্তচাপ, রক্তের ঘনত্ব এবং সতর্কতামূলক লক্ষণগুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই গুজব বা ভুল তথ্যের পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এখনও অনেকে জ্বর হলে গুরুত্ব দেন না, একে সাধারণ জ্বর- সর্দি ভেবে কালক্ষেপণ করেন এবং প্রায়শই জটিল ও মুমূর্ষু হয়ে হাসপাতাল এ যায়, ততক্ষণে আর কিছুই করার থাকে না! পাশাপাশি অনেক রোগী জ্বর হলে পাড়া মহল্লার ছোট ছোট ক্লিনিক এ ভর্তি হয় যেখানে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার কোনও ব্যবস্থা নেই, ফলে ওই রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতাল ঘুরে যখন কাঙ্খিত সেন্টার এ আসে তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আর কিছুই করার থাকে না !! 

তাই অসুখের শুরুতেই এমন একটি হাসপাতাল দরকার যেখানে রোগীর জীবন বাঁচানোর সকল আয়োজন রয়েছে !

এখন আর ডেঙ্গু আর আগের উপসর্গ নিয়ে হাজির হয় না, প্রায়শই দেখা যায় স্নায়বিক দুর্বলতা, কালো পায়খানা এবং শ্বাসকষ্ট নিয়ে হসপিটাল এ আসেন । আবার কোনও কোনো রোগীর জ্বরের উপসর্গ দেখা দিলে ডেঙ্গু টেস্ট পসিটিভ আসেনা, তখন রোগীরা ডেঙ্গু হয়নি ভেবে আর গুরুত্ব দেননা, তখনই ঘটে দুর্ঘটনা । তাই সবসময় চিকিৎসকের পরামর্শ কে গুরুত্ব দিতে হবে ।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এই লড়াই কেবল সরকারের নয়; এটি নাগরিক, পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। একটি মশা যেমন একটি পরিবারকে শোকের অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে পারে, তেমনি একটি সচেতন পরিবার একটি মহল্লাকে নিরাপদ রাখতে পারে।

আমরা বিশ্বাস করি, জ্ঞান, সতর্কতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়েই ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক- ডাঃ আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী

ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা 

ও 

ইউনিভার্সেল মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড, ব্রাহ্মণবাড়িয়া