ক্ষমতার শিখর থেকে ক্রোককৃত সম্পত্তি
দুবাইয়ে বেনজীর গ্রেফতারের পর ফের আলোচনায় সাভানা ইকো রিসোর্ট
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের দুবাইয়ে গ্রেফতারের খবর প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত তার আলোচিত ও বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি সাভানা ইকো রিসোর্ট। একসময় কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে ঘেরা এই বাড়িটি বর্তমানে আদালতের আদেশে ক্রোককৃত সম্পত্তি হিসেবে সরকারি হেফাজতে রয়েছে। গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিদিন বাড়িটি দেখতে ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা উৎসুক মানুষ।
জানা যায়, রূপগঞ্জ উপজেলার পূর্বাচলের দক্ষিণবাগ এলাকার গুতিয়াব মৌজায় অবস্থিত আনন্দ হাউজিং সোসাইটি’র ছয়টি প্লটের ওপর প্রায় ২৪ কাঠা জমিতে নির্মিত হয় দৃষ্টিনন্দন ও অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এই ডুপ্লেক্স বাড়ি। সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড নামে পরিচিত বাড়িটি একসময় বেনজীর আহমেদের ব্যক্তিগত অবকাশযাপন ও অতিথি আপ্যায়নের স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল।তবে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা এই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সামনে আসার পর পাল্টে যায় পরিস্থিতি। ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের হিসাব গোপন এবং অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। এর আগেই একই বছরের ২৩ মে আদালতের নির্দেশে বেনজীর আহমেদের নামে থাকা ৮৩টি দলিলভুক্ত সম্পত্তি এবং ৩৩টি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়।
আরও পড়ুন: থামছে না পুশ-ইন চাপ, অনিশ্চয়তার শেষ কোথায়?
পরে ২৬ মে আদালত বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা আরও ১১৯টি জমির দলিল, ২৩টি কোম্পানির শেয়ার এবং রাজধানীর গুলশান এলাকায় অবস্থিত চারটি ফ্ল্যাট জব্দের আদেশ দেন। একই সময়ে তাদের নামে থাকা প্রায় ৩৪৫ বিঘা বা ১১৪ একর জমি এবং বিভিন্ন ব্যাংকের ৩৩টি হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়। আদালতের ধারাবাহিক আদেশে সব মিলিয়ে প্রায় ৬২৭ বিঘা জমি ক্রোক করা হয়, যার মধ্যে রূপগঞ্জের আলোচিত সাভানা ইকো রিসোর্টও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আদালতের নির্দেশে বাড়িটি ক্রোক হওয়ার পর সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন বাড়িটির সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব গ্রহণ করে। বর্তমানে বাড়িটি সরকারি হেফাজতে সংরক্ষিত রয়েছে এবং প্রশাসনের নিযুক্ত লোকজন নিয়মিত এর নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছেন।
আরও পড়ুন: রাজশাহীর আমের তুলনা নেই: মার্কিন রাষ্ট্রদূত
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশাল এই ডুপ্লেক্স বাড়িটির প্রধান প্রবেশপথগুলো সিলগালা করা রয়েছে। আদালতের নির্দেশনার পর থেকে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাড়ির অভ্যন্তরে থাকা আসবাবপত্র ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী আগের অবস্থাতেই সংরক্ষিত রয়েছে। তবে একসময় নান্দনিক সাজসজ্জা ও পরিচর্যায় সমৃদ্ধ বাগান এবং গাছপালার কিছুটা অবহেলার চিত্র চোখে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় বেনজীর আহমেদ বাড়িটিতে আসলে পুরো এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে যেত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এলাকা সরব থাকত। কিন্তু বর্তমানে সেখানে বিরাজ করছে নিরবতা।
ডুপ্লেক্স বাড়ির পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা রবিন সরকার বলেন,একসময় এই বাড়িতে মালিকের আগমনে পুরো এলাকা জমজমাট হয়ে উঠত। নিরাপত্তার কড়াকড়ির কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলও সীমিত হয়ে যেত। এখন বাড়িটি অনেকটাই নীরব ও জনশূন্য।বাড়িটি দেখতে আসা স্বজল মিয়া বলেন, বেনজীর আহমেদের গ্রেফতারের খবর শোনার পর বাড়িটি নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে। তাই কৌতূহল থেকে বাড়িটি দেখতে এসেছি।
দক্ষিণবাগ বাজারের ব্যবসায়ী ইব্রাহিম মিয়া জানান, দুই-তিন দিন ধরে চায়ের দোকান থেকে বাজারের আড্ডা সব জায়গাতেই বেনজীর আহমেদ ও তার এই বাড়ি নিয়ে আলোচনা চলছে।বাড়িটির কেয়ারটেকার রতন মিয়া বলেন,আদালতের নির্দেশে বাড়িটি সরকারি হেফাজতে যাওয়ার পর থেকে কঠোর নজরদারির মধ্যে রয়েছে। বাইরের কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। বর্তমানে বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছি।এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী বাড়িটির জন্য রিসিভার নিয়োগ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে সম্পত্তিটি সংরক্ষণ করা হচ্ছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং সম্পত্তির সবকিছু নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
একসময় ক্ষমতা ও বিত্তের প্রতীক হিসেবে পরিচিত রূপগঞ্জের এই সাভানা ইকো রিসোর্ট এখন রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা একটি ক্রোককৃত সম্পত্তি। আর দুবাইয়ে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের গ্রেফতারের খবরে সেই বাড়িটিকে ঘিরে আবারও শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও জনমনে নতুন কৌতূহল।





