৬০ ঘণ্টা শূন্যরেখায় দুই শিশু

থামছে না পুশ-ইন চাপ, অনিশ্চয়তার শেষ কোথায়?

Sadek Ali
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:১৭ অপরাহ্ন, ১৬ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৯:৫২ অপরাহ্ন, ১৬ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মানবিক ও কূটনৈতিক সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে। কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে দুই শিশু সন্তানসহ ছয়জন এবং পৃথক আরেক সীমান্তে তিনজন—মোট ৯ জন টানা প্রায় ৬০ ঘণ্টা ধরে শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করলেও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তা প্রতিহত করেছে। ফলে তারা এখন এমন এক অবস্থায় পড়েছেন, যেখানে ভারতেও ফিরতে পারছেন না, আবার বাংলাদেশেও প্রবেশ করতে পারছেন না। 

সীমান্ত সূত্র বলছে, মঙ্গলবার (১৬ জুন) সন্ধ্যা পর্যন্ত রৌমারীর গয়টাপাড়া ও বড়াইবাড়ি ভন্দুরচর সীমান্ত এলাকায় আটকে থাকা ৯ জনের বিষয়ে কোনো সমাধান হয়নি। কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ের পতাকা বৈঠকেও অচলাবস্থা কাটেনি। 

আরও পড়ুন: রাজশাহীর আমের তুলনা নেই: মার্কিন রাষ্ট্রদূত

শূন্যরেখায় মানবিক বিপর্যয়: 

গয়টাপাড়া সীমান্তে সবচেয়ে করুণ অবস্থায় রয়েছেন সুমি আক্তার ও বেলাল হোসেন দম্পতি। তাদের সঙ্গে রয়েছে ছয় মাস বয়সী শিশু ফাইমা ও চার বছরের শিশু ফাতেমা। খোলা আকাশের নিচে দিন-রাত কাটাতে বাধ্য হওয়া এই পরিবারটি সীমান্তের দুই বাহিনীর অবস্থানের মাঝখানে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

আরও পড়ুন: দুবাইয়ে বেনজীর গ্রেফতারের পর ফের আলোচনায় সাভানা ইকো রিসোর্ট

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রবল রোদ, বৃষ্টি ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও পরিবারটি সীমান্ত ত্যাগ করতে পারেনি। মানবিক কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা খাবার, পানি, ছাতা ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করছেন। অন্যদিকে বিএসএফও তাদের কিছু খাদ্যসামগ্রী, কম্বল ও পলিথিন দিয়েছে বলে জানা গেছে। 

কীভাবে শুরু হলো সংকট: 

গত রবিবার (১৪ জুন) ভোরে রৌমারীর গয়টাপাড়া ও ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ মোট ৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের বাধার মুখে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেননি। এরপর থেকেই তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন। 

ভুক্তভোগীরা নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক দাবি করলেও তাদের পরিচয়, নাগরিকত্ব এবং সীমান্ত অতিক্রমের প্রেক্ষাপট যাচাই ছাড়া গ্রহণ করতে রাজি হয়নি বিজিবি। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুসরণের প্রশ্নে অবস্থান নিয়েছে বাহিনীটি। 

শুধু রৌমারী নয়, বাড়ছে সীমান্তজুড়ে চাপ: 

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশের বিভিন্ন সীমান্তে পুশ-ইনের অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসে একাধিক সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের এমন তৎপরতা প্রতিহত করা হয়েছে। গত সপ্তাহে তিনটি সীমান্তে প্রায় ৬০ জনকে এবং তার আগের ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৯০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ করে বিজিবি। 

এদিকে চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে ১১ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ভারতীয় অংশে আরও ১২৫ জনকে জড়ো করার তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে, যা সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। 

কূটনৈতিক প্রশ্নে নতুন চাপ: 

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দেশের নাগরিককে যাচাই-বাছাই ছাড়া সীমান্তে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকেন, তবে প্রচলিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া, নথি যাচাই এবং আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরের মাধ্যমেই তাদের ফেরত পাঠানোর কথা।

এ কারণে রৌমারীর ঘটনাটি এখন শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মানবাধিকার ও কূটনৈতিক যোগাযোগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।

বিজিবির অবস্থান: 

বিজিবি জানিয়েছে, যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা হবে না। সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গ্রহণযোগ্য ও নিয়মতান্ত্রিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সীমান্তে অনুপ্রবেশের কোনো চেষ্টা সফল হতে দেওয়া হবে না। 

অনিশ্চয়তার শেষ কোথায়?

মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সুমি, বেলাল ও তাদের দুই শিশুসন্তানসহ মোট ৯ জনের ভাগ্য ঝুলে রয়েছে শূন্যরেখার অনিশ্চয়তায়। পতাকা বৈঠক হয়েছে, নজরদারি বেড়েছে, মানবিক সহায়তাও পৌঁছেছে—কিন্তু সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনও অধরাই। সীমান্তের কাঁটাতারের মাঝখানে বসে থাকা দুই শিশুর মুখ তাই এখন শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং সীমান্ত রাজনীতির মানবিক মূল্যকেই সামনে এনে দিয়েছে।