যাদুকাটায় থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলন
এমপির কঠোর হুঁশিয়ারির পরও সক্রিয় সিন্ডিকেট, সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা বালুমহালের ইজারাবহির্ভূত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই চলছে অবৈধ বালু উত্তোলন। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান, মোবাইল কোর্ট, স্থানীয়দের মানববন্ধন ও স্মারকলিপি, এমনকি সংসদ সদস্যের প্রকাশ্য হুঁশিয়ারির পরও বন্ধ হচ্ছে না এই কার্যক্রম। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী ও সচেতন মহলের একাংশ প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের পেছনে কারা রয়েছে। অভিযোগের তীর উঠেছে খোদ স্থানীয় সংসদ সদস্যের দিকেও। যদিও এসব অভিযোগ নাকচ করে এমপি কামরুজ্জামান কামরুল বলেছেন, এটি তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার।
রোববার (৬ জুলাই) দুপুরে তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের শান্তিপুর বাজারে সচেতন নাগরিক ও নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের উদ্যোগে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমপি কামরুজ্জামান কামরুল অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান।
আরও পড়ুন: ১৭ নয় হত্যা মামলা ৫টি, অতিরঞ্জিত না লিখে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান: জিএমপি কমিশনার
তিনি বলেন, যাদুকাটা বালুমহালের ইজারাবহির্ভূত মাহারাম নদীর উৎসমুখ, শান্তিপুর, হাজী জয়নাল আবেদীন শিমুল বাগান, পাক্কারমাথা ও গাঘটিয়া ঝলোরটেক এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে দ্রুত বাঁশের বেড়া নির্মাণ করতে হবে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
আরও পড়ুন: সমবায়ভিত্তিক উন্নয়নেই সমৃদ্ধ হবে গ্রামীণ অর্থনীতি: ডা. বাচ্চু এমপি
নাছির মিয়া
সভায় তিনি আরও বলেন, "ইজারাবহির্ভূত এলাকা থেকে বোমা মেশিন দিয়ে কিংবা নদীর তীর কেটে যারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে, তারা আমার আত্মীয়-স্বজন বা দলীয় নেতাকর্মী হলেও কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।"
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাদল মিয়া, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুনাব আলী, যুগ্ম আহ্বায়ক রাখাব উদ্দিনসহ স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।
বক্তারা বলেন, যাদুকাটা বালুমহালের ইজারাবহির্ভূত এলাকা থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। মাহারাম নদীর মুখ, আমতৈল খাল এবং একতা বাজারসংলগ্ন নদীপথে বাঁশের বেড়া নির্মাণের পাশাপাশি নদীতীরবর্তী জমির মালিকদেরও বালু বিক্রি বন্ধে উদ্যোগী হতে হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরে ইজারাদার ও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রাতের আঁধারে বোমা মেশিন ব্যবহার করে এবং নদীর তীর কেটে নিয়মিত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। বিষয়টি নিয়ে একাধিক মানববন্ধন, স্মারকলিপি এবং বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও কার্যত বন্ধ হয়নি এই কর্মকাণ্ড।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর টাস্কফোর্সের কার্যক্রম জোরদার করা হয় এবং একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে বিশেষভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিকের নেতৃত্বে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, বালুভর্তি নৌকা জব্দ, জরিমানা ও মামলা দায়ের করা হলেও অবৈধ বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
অবৈধভাবে নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর দুই তীরের শতাধিক গ্রাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, মসজিদ, মন্দির এবং সরকারের শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন বাদাঘাট ও উত্তর বড়দল ইউনিয়নের দুটি সেতু ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। ইতোমধ্যে একটি সেতুর পাঁচটি গার্ডার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে প্রায় দুই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে যাদুকাটা নদী, এশিয়ার বৃহত্তম শিমুল বাগান এবং আশপাশের পরিবেশ-প্রতিবেশও মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
নাছিরের সহোদর লোকমান
এর আগেও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে যৌথ অভিযানের আহ্বান জানিয়েছিলেন এমপি কামরুজ্জামান কামরুল। এক সভায় তার উপস্থিতিতেই যাদুকাটা বালুমহালের শ্রমিক সংগঠন বিক্ষোভ মিছিল করে। সে সময় তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, "আমি জানি তোমাদের অনেকেই এসবের সঙ্গে জড়িত। আগে তোমরা সাবধান হও।"
তবে এমপির এমন বক্তব্যের পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়দের একাংশ। বিভিন্ন ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়েছে, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে সিন্ডিকেটের কার্যক্রম থামছে না।
উত্তর বড়দল ইউনিয়নের বাসিন্দা ও বিএনপির সমর্থক রফিকুল ইসলাম তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, "সবাই যদি অবৈধ ড্রেজার, নদী কাটা ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, তাহলে এসব অপকর্ম করছে কারা?"
একই ইউনিয়নের পৈলনপুর গ্রামের বাসিন্দা আলা উদ্দিনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, সবাই যদি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাহলে দিনের পর দিন অবৈধ বালু উত্তোলন কীভাবে চলছে।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, যাদুকাটা বালুমহালের ইজারাবহির্ভূত এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি জড়িত। তাদের অভিযোগে বালুমহালের ইজারাদারের স্বজন লোকমান মিয়া এবং মনির ওরফে ইদু মিয়ার নাম উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যুবলীগ নেতার বাসার কেয়ারটেকার মনির ওরফে ইদু মিয়া
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, "আমি জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় জেলা প্রশাসকের কাছে অবৈধ বালু উত্তোলন ও নদীর পাড় কাটা প্রতিরোধে টাস্কফোর্সের অভিযান আরও জোরদার করার অনুরোধ করেছি।"
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "দেশে একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে প্রচারণাও তারই অংশ। আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ওসিকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছি, ইজারাবহির্ভূত এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে আমার আত্মীয়-স্বজন বা দলীয় নেতাকর্মী কেউ জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।"
পরে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল, সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল, পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন (পিপিএম), কমিটির সদস্য এবং জেলার প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।





