বন্ধ মিলের পেটে ১শ টন গম, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে তোলপাড়

Sanchoy Biswas
আশিকুর রহমান, নরসিংদী
প্রকাশিত: ৬:১৮ অপরাহ্ন, ১৬ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৭:৪১ অপরাহ্ন, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

নরসিংদীর শিবপুরের একটি বন্ধ মিলের নামে ১শ টন গম বরাদ্দ দিয়ে সমুদয় গম আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে নরসিংদী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, নরসিংদী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তর কর্তৃক চারটি ফ্লাওয়ার মিলে গম পেষণ করে ফলিত আটা সরকারি গুদামে সরবরাহ করার বিধান রয়েছে। মিলগুলো হচ্ছে, মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিল, কারারচর, শিবপুর, নরসিংদী; মেসার্স এস আফরিন ফ্লাওয়ার মিল, চৈতনা, শিবপুর, নরসিংদী; মেসার্স রহিমা ফ্লাওয়ার মিল, নিতাইগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ এবং মেসার্স মীম শরৎ ফ্লাওয়ার মিল, নিতাইগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ। এই চারটি মিলের মাধ্যমে নরসিংদী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস দীর্ঘদিন যাবৎ গম পেষণ করে আসছে।

আরও পড়ুন: উলিপুরে ইয়াবাসহ যুবক গ্রেপ্তার

তন্মধ্যে, বিগত ঈদুল আজহার পূর্বে থেকে মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলটি বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকার কারণে গত জুন মাসের ৭ তারিখ থেকে মিলের বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়। অথচ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে গত ১৩/০৭/২০২৬ ইং তারিখে মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের অনুকূলে ১শ টন গম বরাদ্দ করা হয়। যার সিডিভি/আইআর/এস.এ.ও নং-২৬২৭-০০০৩২৮৫৬৮৪ (ও.এম.এস), বিলি আদেশ (ডি ও) নং-০১০৪৫৩ ডিওটিতে স্বাক্ষর করেন মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের মালিক মো. মিরাজ আলম ভূঞা।

বরাদ্দকৃত গমের মূল্য ১৯ লাখ টাকা। এতে স্বাক্ষর করেছেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, নরসিংদী সদর-এর কর্মকর্তা জান্নাতি ময়না। এখানে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অধীনে আরও ৩টি ফ্লাওয়ার মিল থাকা সত্ত্বেও বন্ধ মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের নামে কেন ১শ টন গম বরাদ্দ করা হয়েছে, তা বোধগম্য নয়।

আরও পড়ুন: জাতীয় মৎস্য পক্ষ উপলক্ষে খাগড়াছড়িতে র‍্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য নরসিংদী খাদ্য অধিদপ্তর তড়িঘড়ি করে গত ২৬/৭/২০২৬ তারিখে মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের অনুকূলে উপ-বরাদ্দকৃত অবশিষ্ট গম অন্য ৩টি মিলে পুনরায় বরাদ্দ দেন। যার স্মারক নং- ১৩.০১.৬৮০০.০০০.০০০.৫৭.০০০৯.২৫.৬২৮/ পত্রটিতে উল্লেখ রয়েছে যে, মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের অনুকূলে ১৭৬.৬০০ টন গম উপ-বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ইতিমধ্যে গুদাম থেকে ওই মিলের অনুকূলে ১শ টন গম সরবরাহ করা হয়েছে। যার ফলিত আটা গুদামে সরবরাহ করেছেন।

অথচ যে মিলটি চলতি সালের মে মাস থেকেই বন্ধ রয়েছে, সেই মিলের অনুকূলে কীভাবে ১শ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিষয়টি স্থানীয় সংবাদকর্মীদের গোচরীভূত হলে নরসিংদী জেলা খাদ্য অধিদপ্তর ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

এ ব্যাপারে নরসিংদী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছালেহ উদ্দিনকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘আমি কিছুই জানি না। উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা সবকিছু বলতে পারবেন। আমার কাছে কাগজপত্র নিয়ে আসলে আমি এতে স্বাক্ষর করে দেই। বাকি কাজগুলো উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা করে থাকেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলের নামে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো মিল মালিক কীভাবে এবং কোথায় পেষণ করেছেন, তা তদন্ত করলে দেখা যাবে। তদন্তে মিল কর্তৃপক্ষ দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা জান্নাতি ময়না বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা মিলটি পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। এতে বলা হয়েছে যে, মিলের বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ফলে মিলে আটা উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তবে মিল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসকে অবহিত করেননি। তবে মিলের নামে বরাদ্দকৃত ১শ টন গম পেষণ করে গুদামে সরবরাহ করেছেন। মিলের অনুকূলে বরাদ্দকৃত অবশিষ্ট ৭৬.৬০০ টন গমের বরাদ্দ বাতিল করে তিনটি মিলের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়।’

এখানে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, দীর্ঘদিন যাবৎ বন্ধ মিলে কীভাবে ১শ টন গম পেষণ করা হলো।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কারারচরস্থ মেসার্স মেরাজ ফ্লাওয়ার মিলটি দীর্ঘদিন যাবৎ বন্ধ রয়েছে এবং এতে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। মিল মালিক মো. মিরাজ আলম ভূঞা জানান, ‘আমার মিলে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকার কারণে আমি অন্য মিল থেকে গম পেষণ করে গুদামে জমা দিয়েছি।’

খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং ওই অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা এবং মিল মালিকের যোগসাজশে ১শ টন গম হরিলুট করা হয়েছে।

এ গম কেলেঙ্কারির ঘটনা দায় এড়ানোর জন্য এক কর্মকর্তার ঘাড়ে অন্য কর্মকর্তার দোষ চাপানোর চেষ্টা চলছে। বন্ধ মিলের পেটে ১শ টন গম চলে যাওয়ার কারণে নরসিংদীর খাদ্য অধিদপ্তরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ঘটনা সরেজমিনে তদন্ত করলে থলের বিড়াল বের হয়ে আসবে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু দৃষ্টি আকর্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।