জ্বালানিসংকটে আশার আলো
উত্তরবঙ্গে প্রথম গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ার সম্ভাবনা পাবনায়
দেশজুড়ে চলা তীব্র জ্বালানিসংকটের মাঝেই সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে পাবনায়। উত্তরবঙ্গের বুকে প্রথম কোনো প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে ৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরে অনুসন্ধান কূপ খননের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। ‘মোবারকপুর ডিপ-১’ নামের এই প্রকল্প সফল হলে তা শুধু জাতীয় গ্রিডেই গ্যাস সরবরাহ বাড়াবে না, বদলে দেবে পুরো উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক দৃশ্যপট।
দেশে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত ও সফলভাবে খনন করা গ্যাসকূপগুলোর অধিকাংশ চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে। মোবারকপুর ডিপ ১ প্রকল্পে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনায় এবার উত্তরাঞ্চলেও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে সরকার।
আরও পড়ুন: ইয়াবা সেবনকালে দুই তরুণ গ্রেফতার, ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৩ মাসের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড
প্রকল্প সূত্র জানায়, সারাদেশে তিনটি এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাস প্রাপ্তির জোরালো সম্ভাবনা থাকায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১ হাজার ১৩৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনটি গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের একটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এর অধীনে পাবনার মোবারকপুর ডিপ-১ ছাড়াও কুমিল্লা শ্রীকাইল ডিপ-১ ও সিলেট ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১ খনন করা হবে। এ প্রকল্পে সরকার ঋণ হিসেবে ৯০৯ কোটি টাকা দিচ্ছে এবং বাপেক্স নিজস্ব অর্থায়ন থেকে যোগাচ্ছ ২২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
ভূগর্ভের উচ্চ চাপ মোকাবিলা এবং ৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরে খননের কারিগরি দক্ষতার জন্য আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সিএনপিসি চুয়ানচিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড’ (সিসিডিসি)-এর সঙ্গে চুক্তি করেছে বাপেক্স। চীনা এই প্রতিষ্ঠানটি রিগ ফাউন্ডেশন নির্মাণ ও মূল ড্রিলিংয়ের কাজ করবে। সিসিডিসি বর্তমানে কুমিল্লায় কাজ চালাচ্ছে, সেখান থেকেই রিগ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাবনায় স্থানান্তর করা হবে।
আরও পড়ুন: বিএনপির দুই গ্রুপের মারামারি, হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ
বাপেক্স কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাবনার সাথিয়া ও সুজানগর উপজেলার সীমান্তবর্তী মোবারকপুর এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাবনার কথা জানা যায় কয়েক দশক আগেই। ১৯৮০-৮১ সালে পেট্রোবাংলা প্রথম জরিপ চালায়। পরে ১৯৮৩-৮৪ সালে একটি জার্মান প্রতিষ্ঠান এবং ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে বাপেক্স আরও কয়েক দফা ভূতাত্ত্বিক জরিপ করে সম্ভাবনার তথ্য নিশ্চিত হয়।
পরবর্তীতে ২০১৪ সালে মোবারকপুরে ৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সাড়ে চার কিলোমিটার গভীরতায় কূপ খনন শুরু করা হলেও ভূগর্ভের অতিরিক্ত গ্যাসের চাপ ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির অভাবে প্রকল্পটি অসম্পূর্ণ রেখে স্থগিত করতে বাধ্য হয় বাপেক্স।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, ২০১৪ সালে নির্দিষ্ট গভীরতায় পৌঁছানোর পর তীব্র চাপের কারণে কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল, কারণ সেই চাপ মোকাবিলা করে আরও গভীরে যাওয়ার প্রযুক্তি তখন দেশের হাতে ছিল না। তবে প্রথম দফায় সফলতা না এলেও এবার উন্নত আন্তর্জাতিক কারিগরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে আশানুরূপ ফল পাওয়া এবং গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হবে।
অন্যদিকে বাপেক্স জানিয়েছে, আগের অনুসন্ধানস্থল ও পরিত্যক্ত কূপ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে এবার নতুন মোবারকপুর ডিপ-১ কূপে কাজ করা হচ্ছে। এই কূপে সফলতা এলে পুরো অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ জ্বালানি ব্যবহারে আশপাশের এলাকায় পর্যায়ক্রমে আরও একাধিক কূপ খননের সুযোগ তৈরি হবে।
পাবনা জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের মার্চ মাসে আহমেদপুর মৌজার অধিগ্রহণ করা ৬ একর জমি বাপেক্সের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ চলছে। জেলা প্রশাসন এক্ষেত্রে সার্বিক সহযোগিতা করছে।
তিনি আরও বলেন, মোবারকপুর ডিপ-১ সফল হলে পাবনাসহ পুরো উত্তরবঙ্গের গ্যাসসংকট কাটার পাশাপাশি নতুন নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে এবং বিশাল কর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত হবে।
বাপেক্সের উপসহকারী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম জানান, ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাইলিং ও নিরাপত্তা দেয়াল নির্মাণের কাজ গত ২৭ জুলাই শুরু হয়েছে, যা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে।এরপর চীনা প্রতিষ্ঠান রিগ খননের কাজ শুরু করবে।
মোবারকপুর ডিপ ১ এর প্রকল্প পরিচালক ও বাপেক্সের উপমহাব্যবস্থাক (অপারেশনস) এস এ এম মেরাজুল আলম জানিয়েছেন, ২০২৮ সালের জুনের মাঝামাঝি সময়ে কূপে মূল ড্রিলিং শুরু হবে। আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৮ সালের শেষ দিকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু করা সম্ভব হতে পারে।
বাপেক্সের প্রাক্কলন অনুযায়ী, মোবারকপুর ডিপ-১ কূপটি সফল হলে এখান থেকে টানা ২০ বছর ধরে প্রতিদিন অন্তত ২০ মিলিয়ন (২ কোটি) ঘনফুট গ্যাস পাওয়া সম্ভব। পাবনা প্রেসক্লাব সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার বলেন, "ছাত্রজীবন থেকেই মোবারকপুরে গ্যাসের সম্ভাবনার কথা শুনে আসছি। আগের চেষ্টাগুলো ব্যর্থ হলেও আশা করি এবার আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে। মোবারকপুর থেকে গ্যাস পাওয়া গেলে এটি পাবনাবাসীর জন্য অনেক বড় সুসংবাদ বয়ে আনবে"





