সিলেটে তোলপাড়
পলাতক আ.লীগ নেতার ‘উত্তরপূর্ব’ পেল সরকারি ক্রোড়পত্র!
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত সরকারি বিশেষ ক্রোড়পত্রের তালিকায় তোলপাড় শুরু হয়েছে সিলেটে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর যেখানে ফ্যাসিবাদের দোসরদের চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি সর্বত্র, ঠিক তখনই সিলেটের একমাত্র স্থানীয় দৈনিক হিসেবে ওই বিশেষ সরকারি ক্রোড়পত্র বাগিয়ে নিয়েছে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে অভিযুক্ত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের মালিকানাধীন ও প্রকাশনাধীন পত্রিকা ‘দৈনিক উত্তরপূর্ব’।
আরও পড়ুন: ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়: ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেইন
সরকারি এই সিদ্ধান্ত জানাজানি হওয়ার পর থেকেই সিলেটের সাংবাদিক সমাজ, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ, অসন্তোষ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের এমন রহস্যজনক পদক্ষেপে রীতিমতো তোপের মুখে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে যা আছে
আরও পড়ুন: স্ত্রীকে দিয়ে দেহ ব্যবসার অভিযোগ, মিজান বললেন ‘অভাবের তাড়নায় করেছি’
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রেস-১ শাখা থেকে ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে উপসচিব মো: সোলেমান আলীর স্বাক্ষরিত এক অফিসিয়াল স্মারকপত্রে (স্মারক নম্বর: ১৫.০০.০০০০.০০০.০১৯.২৩.০০০১.২৪.৩৬৬) এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। স্মারকে জানানো হয়, ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ পালন উপলক্ষে ঢাকা মহানগর থেকে প্রকাশিত ৮৪টি এবং ঢাকা মহানগরের বাইরে থেকে প্রকাশিত ৭৬টি সহ মোট ১৬০টি দৈনিক সংবাদপত্রে রঙিন ক্রোড়পত্র প্রকাশের সরকারি সম্মতি জ্ঞাপন করা হয়েছে।
ওই স্মারকে ঢাকা মহানগরের বাইরের ৭৬টি মফস্বল সংবাদপত্রের তালিকায় সিলেট জেলা থেকে একমাত্র পত্রিকা হিসেবে স্থান পেয়েছে ৬৭ নম্বর ক্রমিকে থাকা ‘দৈনিক উত্তরপূর্ব’। সিলেট বিভাগের বাকি তিন জেলার মধ্যে হবিগঞ্জ থেকে ‘হবিগঞ্জের জনতার এক্সপ্রেস’ (৬৮ নং), মৌলভীবাজার থেকে ‘দৈনিক বাংলার দিন’ (৬৯ নং) এবং সুনামগঞ্জ থেকে ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’ (৭৬ নং) ক্রোড়পত্র পেলেও খোদ সিলেট জেলা থেকে কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠিত ও জাতীয়তাবাদী ঘরানার স্থানীয় দৈনিককে পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতার পত্রিকাকেই বেছে নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের শর্ত অনুযায়ী, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি) থেকে সরবরাহকৃত এক পূর্ণ পাতার এই রঙিন ক্রোড়পত্রের যাবতীয় ব্যয় বহন করা হবে সরাসরি সরকারি রাজস্ব খাত থেকে। অর্থাৎ রাষ্ট্র ও জনগণের টাকায় পুষ্ট করা হচ্ছে ক্ষমতাচ্যুত ও বিতর্কিত আওয়ামী নেতার প্রতিষ্ঠানকে।
নেপথ্যে বিতর্কিত আওয়ামী নেতা শফিউল আলম নাদেল দৈনিক উত্তরপূর্বের প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও প্রকাশক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী নীতি-নির্ধারক ও দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। এছাড়া তিনি সাবেক বিতর্কিত সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রভাবশালী পরিচালক ছিলেন।
সিলেটে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকালে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলা, দমন-পীড়ন ও সহিংসতার পেছনে নাদেল ও তার চক্রের প্রত্যক্ষ মদদ ও উসকানির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নাদেলের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক নাশকতার মামলা দায়ের করা হয়। বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে থেকে দল পরিচালনা ও বিভিন্ন অপতৎপরতার সাথে জড়িত বলে জানা গেছে। এমন একজন পলাতক ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তির শীর্ষ নেতার পারিবারিক ও দলীয় মুখপত্রকে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের মতো স্পর্শকাতর একটি ঐতিহাসিক দিনে সরকারি ফান্ড দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করায় বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন সবাই।
সাংবাদিক সমাজ ও সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভের বিস্ফোরণ তথ্য মন্ত্রণালয়ের এই তালিকা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পরই প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সিলেটের গণমাধ্যমকর্মীরা একে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং সরকারের ভেতরের গোপন আঁতাত বলে আখ্যায়িত করছেন।
ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সিনিয়র সাংবাদিক ও দৈনিক নয়াদিগন্তের সিলেট ব্যুরো প্রধান আবদুল কাদের তাপাদার ক্ষোভের সাথে মন্তব্য করেন, "জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সিলেটে একমাত্র সরকারি ক্রোড়পত্র পেয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরীর মালিকাধীন পত্রিকা দৈনিক উত্তরপূর্ব! এটি কেবল দুঃখজনক নয়, চরম লজ্জাজনক ও হতাশাজনক।"
ব্যঙ্গ ও ক্ষোভ ঝেড়ে গ্লোবাল টেলিভিশন ও শীর্ষ নিউজের সিলেট প্রতিনিধি সাংবাদিক হেলাল নির্ঝর সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, "জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সিলেটে একমাত্র সরকারি ক্রোড়পত্র পেয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরীর প্রকাশনাধীন পত্রিকা দৈনিক উত্তরপূর্ব! বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থান জিন্দাবাদ।"
সবচেয়ে আবেগঘন ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রবাসী সাংবাদিক অনুক্ত কামরুল। রক্তঝরা আন্দোলন ও সহকর্মীদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি লিখেছেন, "ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে সিলেটের একটি মাত্র স্থানীয় পত্রিকা বিশেষ ক্রোড়পত্র পেয়েছে। আর সেটা হচ্ছে পলাতক আওয়ামী নেতা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম নাদেলের পত্রিকা উত্তরপূর্ব। লীগ নিষিদ্ধ থেকে এভাবেই মোটাতাজা হবে। আর রাজপথে মিছিল করবে। মিছিল ধীরে ধীরে বড় হবে। আর জীবন যাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত ও জালালাবাদের সাংবাদিক শহীদ তুরাবদের।"
তুরাবের আত্মত্যাগ বনাম ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন সিলেটের গণমাধ্যমকর্মীদের মাঝে এই ক্ষোভের পেছনে রয়েছে এক নিদারুণ রক্তাক্ত বাস্তবতা।
গত জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের নির্মম গুলিতে শাহাদাতবরণ করেন সিলেট প্রেসক্লাবের সদস্য এবং দৈনিক নয়াদিগন্ত ও দৈনিক জালালাবাদের সাংবাদিক এটিএম তুরাব। ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে যখন রাজপথে সিলেটের সাংবাদিকরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন, ঠিক সেই সিলেটে গণঅভ্যুত্থানের মাস কয়েক না পেরোতেই ফ্যাসিস্ট নেতাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সাংবাদিকরা অভিযোগ করছেন, বিগত দেড় দশক ধরে আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিয়ে লড়াই করা সিলেটের স্থানীয় পত্রিকাগুলোকে কৌশলে বাইরে রাখা হয়েছে। জাতীয়তাবাদী ও নিরপেক্ষ ধারার অসংখ্য জনপ্রিয় সংবাদপত্র সিলেটে নিয়মিত প্রকাশিত হলেও মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সুকৌশলে সেগুলোকে বঞ্চিত করে খুনিদের মুখপাত্রকে পুরস্কৃত করেছে।
তথ্য মন্ত্রণালয়ে ‘আওয়ামী ভূত’ ও পুনর্বাসন সিন্ডিকেট:
সিলেটের রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, সরকারের উচ্চপদস্থ দপ্তরগুলোতে এখনো ঘাপটি মেরে বসে আছে বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর আমলারা। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র বণ্টন শাখায় কর্মরত কিছু অসাধু কর্মকর্তা পরিকল্পিতভাবে গণঅভ্যুত্থানের উদ্দেশ্যকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
তারা বলছেন, একদিকে সরকার জুলাই গণহত্যার বিচার করছে, ফ্যাসিস্ট দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করছে, অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের ভেতর দিয়ে সেই দলেরই শীর্ষ অর্থদাতাদের কোটি কোটি টাকার সরকারি বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র পাইয়ে দিয়ে আর্থিকভাবে মোটাতাজা রাখা হচ্ছে। ৭ নভেম্বরের মতো জাতীয়তাবাদী চেতনার একটি ঐতিহাসিক দিনে এমন কেলেঙ্কারি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ভুল হতে পারে না; বরং এটি অত্যন্ত পরিকল্পিত পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার অংশ।
তদন্ত ও বাতিলের জোর দাবি:
সিলেটে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতার পত্রিকায় ৭ নভেম্বরের ক্রোড়পত্র প্রদানের এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় অনতিবিলম্বে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জোর দাবি উঠেছে।
সিলেটের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ, জাতীয়তাবাদী সাংবাদিক ও স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে ‘দৈনিক উত্তরপূর্ব’ এর নামে বরাদ্দকৃত সরকারি ক্রোড়পত্রের আর্থিক বিল বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে কার ইশারায় ও কোন গোপন স্বার্থে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় সিলেটের মাটিতে ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসনের যেকোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে রাজপথে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্থানীয় ক্ষুব্ধ সাংবাদিক ও ছাত্র-জনতা।





