নির্বাচনে জোট, নাকি সরকারে

Sadek Ali
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশিত: ১:০৭ অপরাহ্ন, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৩:২৪ অপরাহ্ন, ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের বহুলআলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল। বলতে গেলে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো সহিংসতা, মাস্তানি, নৈরাজ্য এসব ছাড়াই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। যদিও অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, রাতের টকশোওয়ালা বুদ্ধিজীবী বা বিদেশি পর্যালোচকের ভবিষ্যৎবাণী ছিল ভিন্নতর। তাদের আশঙ্কা ছিল হয়তো ভয়াবহ কিছু হবে। এককথায় বলা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ভাবেই অতিক্রান্ত। এবং ফলাফল যা হয়েছে তাতেও জনমনে ব্যাপক কোনো অসন্তোষ পরিলক্ষিত হয়েছে তা-ও বলা যাবে না। রাস্তায় কোনো ডেমোনস্ট্রেশন হয়নি, বিক্ষোভ নেই বরং দলগুলোর প্রাপ্ত আসন সংখ্যা গণমানুষের পূর্ব প্রত্যাশার কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছে।  নির্বাচন শেষে সরাসরি কেউ বলতে পারছে না একদিক-সেদিক বা হেরফের কিছু  হয়েছে।

২. 

আরও পড়ুন: নির্বাচনের ছায়ায় রক্তাক্ত রাজনীতি: সহিংসতার অদম্য প্রবণতা

এবারের নির্বাচন হয়েছে মূলত দুটো দলের ছায়ায় বা আনুকুল্যের ভেতরে থেকে। দল বলতে প্রথমত বিএনপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির 

মত বড় দলের জোটের রাজনীতির প্রয়োজন ছিল না। তবুও হয়তো নানা অদৃশ্য হিসাব নিকাশের কারণে করা হয়েছে। তাছাড়া মাঠে আওয়ামী লীগের মত বড় দলের অনুপস্থিতি এবং তৃণমূলের কর্মীদের নেপথ্যের সমর্থন এটাও নির্বাচনের ফলাফলকে বেশ ভালো ভাবেই প্রভাবিত করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করে। বলা যায়, এবারের নির্বাচনী কৌশলে বিএনপি জোট অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে। তাদের প্রতি গণমানুষের প্রচ্ছন্ন সহানুভূতির বহিঃপ্রকাশও ঘটেছে। মুখ্যত প্রতীকই হয়ে উঠেছে ফলাফলের নিয়ামক শক্তি। একইসাথে বলা যায়, দেশব্যাপী জনমত জরীপেও দলটি আগাগোড়াই এগিয়ে ছিল। এবারের নির্বাচন ঘিরে অভূতপূর্ব গুজব ও প্রোপাগান্ডা ছিল। কল্পনার ফানুস উড়িয়ে যে যার মতন নেরেটিভ তৈরি করেছে। 

আরও পড়ুন: ফেব্রুয়ারি: ভাষার স্মৃতি, বর্তমান ও আমাদের দায়

এর আগে অর্থাৎ গত পঞ্চাশ বছরে কখনো এমনটা দেখা যায়নি। কেউ শুনেনি ভোটের আগের দিনও রাস্তা ঘাটে বলাবলি হয়েছে, 'নির্বাচন হবেনা'। জাতিসংঘ, আমেরিকা, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই করছে, সেই করছে ইত্যাদি। এদিক থেকেও এবারের নির্বাচন ছিল নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। 

৩.

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে জোট বা মোর্চা গঠনের প্রথাকে আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তির এমন জয়জয়কারের যুগে একেবারেই যথাযথ বলে মনে হয় না। বিষয়টি ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে নেওয়া গেলেও এর বাস্তবতা নিয়ে ভাবনার অবকাশ আছে। এবারের নির্বাচনে 

লক্ষণীয় যে, একটা উদীয়মান তারুণ্যনির্ভর, অতি আত্মবিশ্বাসী, গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের দাবিদার  দল মাত্র ৬টি আসন পেয়েছে। তবে তারা এককভাবে নির্বাচন করেনি। করেছে ১১ দলীয় জোটের হয়ে। প্রতীক নিজস্ব হলেও ভোটার এবং সমর্থক সকলের। তারা একক ভাবে নির্বাচন করলে ফলাফল 

কী হতো তা ভাবা যায়? আবার কেউ কেউ ভিন্ন প্রতীক নিয়েও সবচেয়ে বড় দলের সরাসরি আশীর্বাদ পেয়ে বৈতরণি পার

করে যেন অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন। অথচ তাঁরা ঢাকাকেন্দ্রিক জাতীয় পর্যায়ের বড় নেতা। বলা যায়, এঁরা রাজধানীর বড় তারকা লিডার। এখানে এঁদের আসন সর্বত্র সংরক্ষিত থাকে। বাস্তবতা হল, এঁদের অনেকেরই নিজের এলাকায় নূন্যতম জনসম্পৃক্ততা নেই, পরিচিতি নেই। কিন্তু আসন্ন সংসদে হয়তো কথার ঝড় তুলে দিবেন। বাস্তবে এঁরা কোন্ দলের সমর্থকের পক্ষে বলবেন? 

অন্যদিকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে লাখের কাছাকাছি ভোট পেয়েও পরাজিত হয়েছেন একাধিক জনপ্রিয় দলীয় নেতা। যার  গ্রহণযোগ্যতা ঘরে-বাইরে সব জায়গায় প্রশ্নাতীত ছিল। তিনি জোটের বলী হয়েছেন। কেউ আবার কঠোর বিদ্রোহী হয়েও 

জয় নিয়ে সগৌরবে ফিরে এসেছেন। অনেকে বলেন, এলাকায় ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় ভোটের খবর নেই কিন্তু সংসদে আসন আছে। এটা ভাগ্য বলে কথা। মানুষের ললাটের লিখন নাকি কেউ খন্ডন করতে পারে না। আবার দেখা গেছে, কোনো কোনো রাজনীতিবিদ নিজের তৈরি করা  তিন-চার দশকের পুরানো দলকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে বড় দলের পেটে বিলীন করে দিয়ে কেবল একজন এমপি হতে চেয়েছেন। তবে এঁরা বেশির ভাগই সফল হতে পারেন নি। মানুষ গ্রহণ করেনি। তাঁরা একূল-ওকূল দু-কূল হারিয়েছেন। তাঁদের টার্গেট মূলত রাজনীতি নয় এর চেয়ে ঢেরবেশি এমপি হওয়া। 

৪.

এদেশের রাজনীতির অতীত ইতিহাস বলে, একনেতা, একদল এবং নিজের প্রতীকের ওপর বিশ্বাসী হয়ে একটি আসন নিয়েও কেউ কেউ সংসদ ভবনের হিরো হয়েছিলেন। সমগ্র জাতির নজরে পড়েছিলেন। শুধু এদেশে নয় এমনটা ভারতের লোকসভায় বা অন্য দেশেও নজির আছে। অথচ বর্তমানে এখানে এমন পর্বতসম জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সংকট মারাত্মক ভাবে চোখে পড়ছে। সময় এসেছে, দলের বাইরের যোগ্য, শিক্ষিত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বদের অন্বেষণ করতে হবে।

এদিক থেকে বরঞ্চ যারা নিজের দল, নিজের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন বা জামানত হারিয়েছেন তাঁদেরকে বাহবা দেওয়া উচিত। কমিউনিস্ট পার্টি, নাগরিক ঐক্য বা অন্য যাঁরাই করেছেন তাঁরা ব্যক্তিত্ববান বিধায় গৌরববোধ করতে পারেন। অপর দিকে যাঁরা নিজের দলকে শক্তিশালী ও কর্মীবান্ধব না করে সবসময় অন্যের কাঁধের ওপর হাত রেখে বড় রাজনীতিক হতে চান তাঁদের জন্য করুণা হয়। তাঁদের উচিত নিজের দলকে সাইনবোর্ড সর্বস্ব না বানিয়ে মাঠে ঘাটে বিস্তৃত করা। আদর্শ উদ্দেশ্য নিয়ে প্রচার করা। অন্তত নিজের নির্বাচনী এলাকায় বটবৃক্ষের মত দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থান তৈরি করা। অথবা প্রয়োজনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোট করা। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যাতে করে স্বাধীনভাবে সকল নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন এর ওপরও অধিকতর গুরুত্বারোপ করতে হবে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া গনতন্ত্রের জন্য আশীর্বাদ এবং  অপরিহার্য। একটা জাতীয় নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য, গণআস্হাশীল হয়েছে তা প্রমাণ করে দলহীন স্বতন্ত্র কতজন সদস্য নির্বাচিত 

হয়ে এসেছেন?  

৫.

ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত করার আগে আলোচ্য বিষয়গুলো বিবেচনা করার সময় এসেছে। আসন্ন যে সংসদ গঠিত হতে চলেছে তাঁরা বলা যায়, নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছেন। মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। তাঁদেরকে পার্লামেন্টে নানা বিষয়ের সংস্কার প্রস্তাবে নিয়ে কাজ করতে হবে। পশ্চিমা বিশ্বের দেশসমূহের মত এখানেও নির্বাচনের পরে জোট হতে পারে। এটা কেবল সরকার গঠনের প্রশ্নে। ভোটের ক্ষেত্রে জোট করা কতটা যৌক্তিক তা আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। সংসদ হোক উচ্চশিক্ষিত, সৎ, মেধাবী,  দেশপ্রেমিক ও তারুণ্যদীপ্ত। জাতীয়  সংসদেই সমগ্র জাতির আশা- আকাংখার বাস্তব প্রতিফলন ঘটুক।


: গল্পকার ও কলাম লেখক