ওয়েস্টমিনস্টার মডেল: গণতন্ত্রের আড়ালে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ

Any Akter
এম এ মতিন
প্রকাশিত: ২:২২ অপরাহ্ন, ০৮ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৪:০৯ অপরাহ্ন, ০৮ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশ, আজও ওয়েস্টমিনস্টার ধরনের সংসদীয় সরকারব্যবস্থা অনুসরণ করছে। দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থাকে গণতন্ত্রের অন্যতম আদর্শ মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও জনবহুল দেশে এই কাঠামো কার্যকর জনপ্রতিনিধিত্ব, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার পরিবর্তে বরং প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক কেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতি এবং অদক্ষতাকে উৎসাহিত করছে।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা যুক্তরাজ্যের বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ব্রিটেনে ওয়েস্টমিনস্টার ব্যবস্থা শত শত বছরের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং প্রশাসনিক পরিপক্বতার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। কিন্তু বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে এখনও দুর্বল প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দলীয়করণ, পরিবারতন্ত্র, দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক প্রভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বিদ্যমান। ফলে একই মডেল এখানে কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে প্রায়ই শাসন সংকট সৃষ্টি করে।

আরও পড়ুন: সুশাসনের অগ্নিপরীক্ষা: দল শুদ্ধির পর এবার প্রশাসনের পালা

এই ব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে কার্যকর বিভাজনের অভাব। ওয়েস্টমিনস্টার মডেলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই মন্ত্রী হন এবং সরাসরি প্রশাসন পরিচালনা করেন। অর্থাৎ যারা সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা, তারাই আবার সরকারের অংশ হয়ে যান। এতে কার্যকর চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স ধ্বংস হয় এবং সংসদের স্বাধীনতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

তাত্ত্বিকভাবে সংসদের দায়িত্ব সরকারের কার্যক্রম তদারকি করা। কিন্তু বাস্তবে সংসদ সদস্যদের বড় অংশ দলীয় নেতৃত্বের প্রতি বেশি দায়বদ্ধ হয়ে পড়েন। ফলে সংসদ জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে অনেক সময় নির্বাহী বিভাগের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়। এতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ সৃষ্টি হয় এবং গণতন্ত্রের প্রকৃত ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

আরও পড়ুন: "রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: তিন চ্যালেঞ্জের গোলকধাঁধায় নতুন সরকার"

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই সমস্যা আরও গভীর। একটি রাজনৈতিক দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই কার্যত আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দলীয় স্বার্থ অনেক সময় জাতীয় স্বার্থের উপরে স্থান পায়

এই ব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো মন্ত্রী নিয়োগ প্রক্রিয়া। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মন্ত্রী নির্বাচন করা হয় রাজনৈতিক আনুগত্য, দলীয় প্রভাব অথবা নির্বাচনী শক্তির ভিত্তিতে; প্রশাসনিক দক্ষতা, পেশাগত যোগ্যতা বা বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের ভিত্তিতে নয়। ফলে এমন বহু ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান যাদের রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কূটনীতি বা প্রশাসন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নেই।

আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা অত্যন্ত জটিল বিষয়। অর্থনীতি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা কিংবা পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞ জ্ঞান প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, রাজনৈতিক জনপ্রিয়তাই অনেক সময় যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। এর ফলে নীতিনির্ধারণে দুর্বলতা, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ব্যর্থতা দেখা দেয়।

অন্যদিকে দেশের প্রকৃত মেধাবী ও দক্ষ ব্যক্তিরা রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান না। আন্তর্জাতিক মানের অর্থনীতিবিদ, প্রযুক্তিবিদ, প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞ বা শিক্ষাবিদরা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হলেও তারা নির্বাচিত রাজনীতিবিদ না হওয়ায় নির্বাহী নেতৃত্বে আসতে পারেন না। ফলে রাষ্ট্র প্রকৃত দক্ষতাকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়।

এই পরিস্থিতি আমলাতন্ত্রের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করে। অদক্ষ বা অনভিজ্ঞ মন্ত্রীরা প্রায়ই আমলাদের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। ফলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পরিবর্তে স্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিক প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এতে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা দুর্বল হয় এবং প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।

ওয়েস্টমিনস্টার ব্যবস্থা রাজনৈতিক দুর্নীতিকেও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। মন্ত্রীত্ব অনেক সময় জনসেবার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন এবং দলীয় স্বার্থ রক্ষার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা বৃদ্ধি পায়।

এই কাঠামো প্রকৃত নেতৃত্বের বিকাশেও বাধা সৃষ্টি করে। প্রকৃত নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন দক্ষতা, সততা, দূরদর্শিতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক সময় যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক কৌশল বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে যোগ্য ও দূরদর্শী মানুষ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান এবং রাষ্ট্র পরিচালনা ক্রমশ পেশাদার নেতৃত্বের পরিবর্তে দলভিত্তিক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।

এছাড়া বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও সামাজিকভাবে বৈচিত্র্যময় দেশে এই ব্যবস্থা প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতেও ব্যর্থ হচ্ছে। জনগণ স্থানীয় প্রতিনিধিদের ভোট দিলেও অনেক সময় সেই প্রতিনিধিরা জনগণের চেয়ে দলীয় নেতৃত্বের কাছে বেশি দায়বদ্ধ হয়ে পড়েন। এতে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর রাজনৈতিক কেন্দ্রীয়করণের মধ্যে হারিয়ে যায়।

তাই এখন সময় এসেছে রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করার। আমাদের ধীরে ধীরে প্রচলিত ওয়েস্টমিনস্টার ধরনের কাঠামো থেকে বের হয়ে আরও আধুনিক, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে হবে। এমন একটি ব্যবস্থায় মন্ত্রী শুধুমাত্র নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে নিয়োগ না দিয়ে যোগ্য, অভিজ্ঞ এবং পেশাগতভাবে দক্ষ ব্যক্তিদের মধ্য থেকে স্বচ্ছ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দিতে হবে।

আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা অপরিহার্য। তাই অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি, প্রযুক্তি, পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব দেওয়া উচিত।

তবে একইসঙ্গে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাও শক্তিশালী থাকতে হবে। মন্ত্রীরা সংসদের বাইরে থেকে এলেও তাদের অবশ্যই সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সংসদ সদস্যরা নিয়মিতভাবে মন্ত্রীদের নীতি, কার্যক্রম, ব্যয় এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবেন। এতে প্রশাসনে স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

এ ধরনের একটি আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রভাব কমাবে, প্রশাসনিক পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি করবে, দুর্নীতি সীমিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনাকে শক্তিশালী করবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে,এতে রাষ্ট্র পরিচালনা রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে দক্ষতা ও জনগণের স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।

বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। নতুন প্রজন্ম কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং কার্যকর শাসনব্যবস্থা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দক্ষ নেতৃত্ব দেখতে চায়। তাই শুধুমাত্র ব্যক্তি পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোগত সংস্কারও আজ জাতীয় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বা আমলা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয় বরং রাষ্ট্র জনগণের। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যবস্থাও এমন হতে হবে যা জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, সুশাসন এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সক্ষম।