'সুশাসনের অগ্নিপরীক্ষা: কঠোর প্রশাসনিক নীতি বনাম মাঠপর্যায়ে পুলিশের নির্লিপ্ততা'

Any Akter
শেখ এমদাদুল হক মিলন
প্রকাশিত: ৩:৫৭ অপরাহ্ন, ২০ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৩:৫৭ অপরাহ্ন, ২০ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

​জনসেবা নিশ্চিতকরণ এবং মাঠপর্যায়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে কার্যকর করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার সম্প্রতি একটি অত্যন্ত দূরদর্শী ও অনমনীয় প্রশাসনিক অবস্থান গ্রহণ করেছে। জনপ্রশাসন ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জনসেবা প্রদান কিংবা সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের মধ্যে অবহেলা, শৈথিল্য ও অদক্ষতার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হবে, আর ২৫ বছর পূর্ণ না হলে সাময়িক বরখাস্তের মতো কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। ইতিমধ্যেই দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের এই নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই কঠোর নীতিগত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাতেই হয়, কারণ প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং শৈথিল্য জনগণের মধ্যে তীব্র আস্থা সংকট তৈরি করে।

​কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের এই কড়াকড়ি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সাথে কতটা সংগতিপূর্ণ? 

আরও পড়ুন: এ যেন স্বপ্নজয়ের আনন্দ!

আমি আমার পূর্ববর্তী কলামে "সুশাসনের অগ্নিপরীক্ষা: দল শুদ্ধির পর এবার প্রশাসনের পালা"-এ স্পষ্ট উল্লেখ করেছিলাম যে, একটি রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হলে কেবল রাজনৈতিক দলের নৈতিক পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, বরং প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা অনিয়ম দুর্নীতি দূর করা সবচেয়ে জরুরি। সেখানে আমি দেখিয়েছিলাম, মাঠপর্যায়ে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিএনপি তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের কঠোর 'জিরো টলারেন্স' নীতি ও শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মাঠের একটি বড় রাজনৈতিক দল যদি নিজেদের এতটা শৃঙ্খলিত করতে পারে, তবে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন এখনো খোলস বদলে পূর্বের ন্যায় স্থবির হয়ে থাকবে?

​১. পুলিশের চোখের সামনে নিষিদ্ধ সংগঠনের আস্ফালন: কার স্বার্থে?

আরও পড়ুন: জনগণের বাজেট এবং গণআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন: সংকট উত্তরণ ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

আজ দেশবাসীর মনে সবচেয়ে বড় ক্ষোভ ও বিস্ময়ের জায়গা হলো আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর, বিশেষ করে পুলিশের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা। যে দলটিকে এদেশের ছাত্র-জনতা এক ঐতিহাসিক ও রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিতাড়িত করেছে এবং যার বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনকে রাষ্ট্র আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, সেই নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কর্মীরা এখনো কি করে খোদ পুলিশের চোখের সামনে বুক ফুলিয়ে মহড়া দেওয়ার এবং শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ পায়? পুলিশের এই নির্লিপ্ততা ও রহস্যজনক নীরবতা সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিটি সরকারি উদ্যোগকে জনগণের সামনে প্রহসনে পরিণত করছে। পুলিশের এই অদক্ষতা ও নৈতিক স্খলন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা কি ফ্যাসিবাদের পুরোনো দোসরদের পুনর্বাসনের সুযোগ করে দিচ্ছে, নাকি পর্দার আড়ালে কোনো গোপন আঁতাত কাজ করছে—এই প্রশ্ন এড়ানো এখন অসম্ভব।

​২. 'সিলেক্টেড' প্রশাসকদের সমন্বয়হীনতা ও মাঠের ব্যর্থতা

আমার পূর্ববর্তী বিশ্লেষণে আমি দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহর ও সিটি কর্পোরেশনগুলোতে নিয়োজিত মনোনীত বা 'সিলেক্টেড' প্রশাসকদের একাংশের অনিয়ম ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের সাথে আঁতাতের চিত্র তুলে ধরেছিলাম। আজ মাঠপর্যায়ে পুলিশের এই চরম নিষ্ক্রিয়তার কারণে সেই মনোনীত প্রশাসকরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং মাঠের অপকর্ম রুখতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছেন। একদিকে সরকার অবহেলার কারণে আমলাদের চাকরিচ্যুতির হুমকি দিচ্ছে, অন্যদিকে মাঠের পুলিশ ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মাদের আস্ফালন দেখেও চোখ বুঁজে থাকছে। এই প্রশাসনিক ও আইনগত সমন্বয়হীনতা সুশাসনের মূল অন্তরায়।

​৩. শুধু ফরমান জারি নয়, পুলিশের পিঠে লাগাম টানুন

আমরা সরকারকে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই—কেবল কাগজের পাতায় ২৫ বছরের বাধ্যতামূলক অবসরের ফরমান জারি করে আমলাদের ভয় দেখালেই রাষ্ট্রের সংস্কার হবে না। পুলিশ বাহিনীকে আমূল পুনর্গঠন এবং এর ভেতরের ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসরদের সমূলে উৎপাটন করতে কেন এই দীর্ঘসূত্রতা? কেন এখনো পুলিশ কর্মকর্তারা তাদের পুরোনো ঔপনিবেশিক ও রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির মানসিকতা ধরে রাখার সাহস পাবে? স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন করে এই বাহিনীকে অনতিবিলম্বে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় তাগিদ। পুলিশকে যদি শক্ত হাতে পেশাদার বাহিনী হিসেবে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় করা না যায়, তবে কোনো প্রশাসনিক নীতিই আলোর মুখ দেখবে না।

​উপসংহার:

পরিশেষে, সুশাসনের এই কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে সরকারকে তার দ্বিমুখী নীতি পরিহার করতে হবে। একদিকে প্রশাসনের রশি টানা আর অন্যদিকে মাঠের পুলিশকে নিষ্ক্রিয় রেখে নিষিদ্ধ সংগঠনের শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া—একই সাথে চলতে পারে না। বিএনপি তাদের কর্মী বাহিনীকে কঠোর শৃঙ্খলায় এনে মাঠের বার্তা পরিষ্কার করেছে; এখন রাষ্ট্রযন্ত্রের লাগাম টানার একক দায়িত্ব সরকারের। পুলিশ বাহিনীকে অবিলম্বে সক্রিয় এবং কঠোর আইনি ভূমিকায় দেখতে চায় দেশের সাধারণ মানুষ। সরকার যদি অনতিবিলম্বে পুলিশ বাহিনীকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এনে ফ্যাসিবাদের দোসরদের মাঠপর্যায়ে দমন করতে না পারে, তবে আমলাদের বিরুদ্ধে নেওয়া এই 'বাধ্যতামূলক অবসর' বা 'সাময়িক বরখাস্তের' কঠোর সিদ্ধান্তগুলো কেবলই লোকদেখানো চাতুর্য হিসেবে প্রমাণিত হবে।


​লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।