দুর্নীতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও সুশাসনের সংকট: এলজিইডির অশুভ চক্র ভাঙার এখনই সময়

Sanchoy Biswas
শেখ এমদাদুল হক মিলন
প্রকাশিত: ৯:৪৭ অপরাহ্ন, ২৪ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১১:১৫ অপরাহ্ন, ২৪ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

​একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ বিনির্মাণের মূল ভিত্তি হলো সর্বস্তরে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্র সংস্কারের এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন সাধারণ মানুষ একটি স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখছে, ঠিক তখনই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেবা সংস্থা—স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত আমাদের সেই জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

গত ২৪ জুন, ২০২৬ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এজাহারভুক্ত এবং সরকারি তহবিল আত্মসাতের মামলার অন্যতম প্রধান আসামি মো. ছাবের আলীকে ময়মনসিংহের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) পদে পদায়ন করা হয়েছে। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত এই অফিস আদেশটি কেবল সৎ ও পেশাদার প্রকৌশলীদের মধ্যেই ক্ষোভের জন্ম দেয়নি, বরং এটি রাষ্ট্র সংস্কারের চলমান গতিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক সুগভীর অপচেষ্টা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

আরও পড়ুন: দেশের ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক নতুন মাইলফলক

অভিযোগের পাহাড় ও বিতর্কিত পদায়নের নেপথ্য

​দুদকের নথি অনুযায়ী, রাজধানীর গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের নির্মাণকাজ সমাপ্ত না করেই ভুয়া বিলের মাধ্যমে সরকারি তহবিল থেকে ১ কোটি ২২ লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ছাবের আলীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের একাধিক ধারায় মামলা রয়েছে। প্রশাসনিক সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, যেখানে এমন গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের আসামিকে সাময়িক বরখাস্ত কিংবা ওএসডি (OSD) করে রাখার কথা, সেখানে তাকে ঢাকা সদর দপ্তর থেকে সরিয়ে মাঠপর্যায়ের অন্যতম বড় ও লোভনীয় চেয়ারে বসানো হয়েছে।

আরও পড়ুন: টাঙ্গুয়ার হাওর: বরাদ্দ নয়, বদলাতে হবে ব্যবস্থাপনার দর্শন

অধিদপ্তর জুড়ে এখন প্রবল গুঞ্জন, জুন ক্লোজিংয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে জারি করা এই লোভনীয় পদায়নের পেছনে প্রায় ৭০ লাখ টাকার অনৈতিক লেনদেন হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বদলির পেছনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ মহলের তথাকথিত 'মৌখিক নির্দেশনার' যে ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়েছে, তা প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড এবং স্বচ্ছতাকে বুড়ো আঙুল দেখানোর শামিল। এটি প্রমাণ করে যে, এলজিইডিতে এখনো দুর্নীতিবাজ ও সুবিধাভোগী চক্রের অশুভ সিন্ডিকেট কতটা শক্তিশালী ও সক্রিয়।

নিয়োগ ও পদোন্নতিতে আইনি লঙ্ঘন: গোড়াতেই গলদ

​মো. ছাবের আলীসহ ২০১০ ও ২০১১ সালের যেসব সহকারী প্রকৌশলীকে বর্তমানে 'চলতি দায়িত্বে' নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, আইনি ও প্রশাসনিক নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের চাকরির বৈধতাই আজ চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। বিগত সরকারের আমলে প্রশাসনিক বিধিমালা লঙ্ঘন করে ঘটা এই জালিয়াতির চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ:

রাজস্ব খাতে অনিয়মতান্ত্রিক অনুপ্রবেশ: এই কর্মকর্তারা মূলত বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্পে চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় ও অনৈতিক সুবিধা লেনদেনের মাধ্যমে কোনো প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই তাদের রাজস্ব খাতে নিয়মিতকরণ করা হয়, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

শিক্ষাগত যোগ্যতার চরম জালিয়াতি: সবচেয়ে বিস্ময়কর ও বৈসাদৃশ্যপূর্ণ বিষয় হলো, এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন কৃষি (Agriculture) এবং মেকানিক্যাল (Mechanical) ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী। কিন্তু এলজিইডিতে এসে ক্ষমতার জোরে তারা রাতারাতি 'সিভিল ইঞ্জিনিয়ার' বনে যান এবং সিভিল ক্যাডারের পদগুলো দখল করেন। কৃষি বা মেকানিক্যালের ছাত্র হয়ে কীভাবে তারা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের টেকনিক্যাল পদে পদোন্নতি পাচ্ছেন, তা এক প্রশাসনিক রহস্য।

পিএসসি ও মন্ত্রণালয়ের বাধ্যবাধকতা অমান্য: সরকারের প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড পদে নিয়োগ বা নিয়মিতকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সরাসরি সুপারিশ নেওয়া সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু এদের ক্ষেত্রে পিএসসির কোনো সুপারিশই নেওয়া হয়নি। এমনকি প্রথম শ্রেণীর পদে নিয়োগের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের যে পূর্ব-সম্মতি বা ক্লিয়ারেন্স নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা পুরোপুরি লঙ্ঘন করা হয়েছে।

আর্থিক বিধিমালার ব্যত্যয়: এই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের চাকরি নিয়মিতকরণ এবং পরবর্তীতে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হয়নি, যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও আর্থিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী।

দুর্নীতি বনাম টেকসই উন্নয়ন: একটি ঐতিহাসিক বৈপরীত্য

​এলজিইডির কাঁধে ন্যস্ত থাকে দেশের গ্রামীণ অবকাঠামো, সড়ক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানসম্মত উন্নয়ন নিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব। কিন্তু গোড়াতেই যাদের নিয়োগ অবৈধ, শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ এবং যারা কোটি টাকা আত্মসাতের মামলার আসামি—তারা যখন পুরস্কৃত হয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ জেলার দায়িত্ব পায়, তখন টেকসই উন্নয়নের স্বপ্ন ভেস্তে যেতে বাধ্য। দুর্নীতির এই কালো হাত এবং নিয়োগ জালিয়াতির সিন্ডিকেট যদি এখনই ভেঙে দেওয়া না যায়, তবে জনগণের করের টাকা লুটপাটের মহোৎসব চলতেই থাকবে এবং তা রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দেবে।

বিএনপি সরকারের মিশন, ভিশন ও রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার

​এই প্রশাসনিক নৈরাজ্য, জালিয়াতি ও দুর্নীতির বেড়াজাল থেকে দেশকে মুক্ত করতে রাষ্ট্র সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি দেশের মানুষের সামনে যে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামোর 'ভিশন' এবং 'মিশন' (৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখা) উপস্থাপন করেছে, তার মূল ভিত্তিই হলো—দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, মেধাভিত্তিক প্রশাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা।

​বিএনপি সরকারের ঘোষিত ভিশন ও মিশনের আলোকে এই সংকট দূরীকরণে নিচের বিষয়গুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি:

​১. দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: বিএনপির মিশন ও ভিশনের স্পষ্ট অঙ্গীকার হলো, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ জালিয়াতি এবং সরকারি অর্থের অপচয় বা আত্মসাতকারীদের কঠোর হস্তে দমন করা। ছাবের আলীর মতো চিহ্নিত আসামিদের পদায়ন এবং অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্তদের পদোন্নতি বিএনপির এই ঘোষিত নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

​২. প্রশাসনিক সংস্কার ও মেধার মূল্যায়ন: দলীয় বা অনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পিএসসির মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মেধা, সততা ও সঠিক যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশাসনে নিয়োগ ও পদায়ন নিশ্চিত করা বিএনপির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কৃষি বা মেকানিক্যালের ছাত্র হয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার সেজে থাকা এবং পিএসসিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে ছাঁটাই করা এই সংস্কারেরই অংশ।

​৩. দুদক ও শাসন ব্যবস্থার স্বাধীনতা: বিএনপি তার রূপরেখায় স্পষ্ট করেছে যে, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে। দুদক যে আসামির বিরুদ্ধে মামলা করেছে, তাকে প্রশাসনিকভাবে পুরস্কৃত করার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে এবং অতীতে মন্ত্রণালয়ের সম্মতি ছাড়া হওয়া সকল অবৈধ নিয়োগ বাতিল করতে হবে।

​৪. সিন্ডিকেট ও অশুভ কালো হাত ভেঙে দেওয়া: প্রশাসনে বিগত আমলের রাজনৈতিক বিবেচনায় গড়ে ওঠা বদলি-বাণিজ্য, ব্যাকডোর এন্ট্রি এবং 'মৌখিক নির্দেশনার' নামে চলা স্বৈরাচারী কালচার ভেঙে একটি জবাবদিহিমূলক ও আইনসম্মত শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাই বিএনপির মূল ভিশন।

উপসংহার

​একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা কখনোই ভোয়া শিক্ষাগত যোগ্যতা, জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি পাওয়া এবং দুর্নীতির মামলার আসামি আমলা বা প্রকৌশলীদের কাঁধে ভর করে আসতে পারে না। এলজিইডিতে পিএসসি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ম লঙ্ঘন করে হওয়া অতীত নিয়োগগুলো পুনঃতদন্ত করা এবং ছাবের আলীর মতো বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদায়ন অবিলম্বে বাতিল করে তাদের আইনের মুখোমুখি করা এখন সময়ের দাবি। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভিশন অনুযায়ী যদি সত্যিই আমরা একটি নতুন, বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই—তবে এলজিইডির এই অশুভ দুর্নীতির সিন্ডিকেট ও কালো হাত এখনই ভেঙে দিতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

​লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।