সামরিক নেতৃত্বে নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব-বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট
১। ভূমিকা: বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় সেনাবাহিনীর গুরুত্ব অপরিসীম। তাই পেশাদার ও দক্ষ সেনাবাহিনীর গুণাবলিসমূহের যথাযথ সংমিশ্রণ অপরিহার্য। "একজন পেশাদার সৈনিকের প্রথম গুণ হলো আনুগত্য, দ্বিতীয়টি শৃঙ্খলা এবং তৃতীয়টি হলো সাহসিকতা; তবে এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে হলো তার নৈতিক স্বচ্ছতা।" - ফিল্ড মার্শাল ফিলিপ চ্যাটউড (তার বিখ্যাত 'ঈযবঃড়িফব গড়ঃঃড়' এর ভাবার্থ)। অর্থাৎ "নৈতিকতা” ও “পেশাদারিত্ব” উভয়ই যেকোনো সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে অপরিহার্য। বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর জন্ম হয়েছে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যা এনে দিয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা, একটি নতুন দেশ। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনী তথা সেনাবাহিনী দেশ গঠন, দুর্যোগ মোকাবেলা এবং দেশের যেকোন ক্রান্তিলগ্নে সব সময় জনগণের পাশে ছিল।
নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বই আস্থা, কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি। তাই স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার পেশাদারিত্ব এবং নৈতিকতার সংমিশ্রণে কতটুকু সফল হয়েছে এবং ফলশ্রুতিতে জনগণের কতটুকু আস্থা অর্জন করতে পেরেছে, তাই এই প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য।
আরও পড়ুন: জুলাই সনদের এক বছর: সংস্কারের অঙ্গীকার, বাস্তবায়নে ধীরগতি
২। নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব: সামরিক নৈতিকতা বলতে আমরা বুঝি, সততা, জবাবদিহিতা, আনুগত্য ও শৃঙ্খলা। আবার এই গুণাবলিসমূহ শুধুমাত্র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সামনে বা শাস্তির ভয়ে অনুশীলন করা প্রকৃত নৈতিকতা নয়। বরং সকলের অগোচরে নিজ থেকেই আন্তরিকতার সাথে এই গুণাবলিসমূহ চর্চা করাই নৈতিকতা। সামরিক প্রেক্ষাপটে পেশাদারিত্ব বলতে বুঝি যোগ্যতা, অরাজনৈতিক অবস্থান এবং চেইন অফ কমান্ড মেনে চলা। পেশাগত জ্ঞান অর্জন এবং তার সঠিক প্রয়োগ যোগ্যতার পরিচায়ক। পাশাপাশি আধুনিকতা এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিজেকে প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।
সেনাবাহিনীকে তার আন্তর্জাতিক মানদ- ধরে রাখার জন্য "রুলস অফ এনগেজমেন্ট" এবং "ল অফ আর্মড কনফ্লিক্ট" সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন এবং সে অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হয়। একজন পূর্ণাঙ্গ সামরিক নেতৃত্বের জন্য নৈতিকতা এবং পেশাদারিত্ব উভয় গুণাবলীই অপরিহার্য। নৈতিকতার ঘাটতি যেমন আস্থার সংকট সৃষ্টি করে, তেমনি পেশাদারিত্বের অভাবে একজন সামরিক কমান্ডার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের অভ্যন্তরে এবং জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাতিক পরিম-লে দায়িত্ব পালন করে যথাযথ যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে এবং এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।
আরও পড়ুন: রাজধানী ঢাকা শহরকে অচল করে তুলতে মরণফাঁদ অটোরিকশাই যথেষ্ট
৩। বাংলাদেশের সামরিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্ম একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, যা একই সঙ্গে যেমন এদেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে তেমনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে এদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে চিরঅম্লান করে রেখেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে তৎকালীন বাংলাদেশী সেনা নেতৃত্ব তাদের পেশাদারিত্বের চরম উৎকর্ষতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অধীনস্থদের যেমন সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পেরেছিল, তেমনি তাদের সঠিক নৈতিক অবস্থানের কারণে তাদের নেতৃত্বে আস্থা রেখে অধীনস্থ জওয়ান ও আপামর জনগণ জীবনকে তুচ্ছ করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলো। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে এবং প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পেশাদারিত্ব এবং নৈতিকতা বিচ্যুতি কখনো দেখা যায়নি। যার ফলে বাংলাদেশের জনসাধারণ দেশের স্বার্থ রক্ষায় এখনো তার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে সেনাবাহিনীকে বিশ্বাস করে এবং এই বাহিনীর প্রতি আস্থা রেখে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। দেশের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে সেনাবাহিনী নির্মোহভাবে জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে এবং জনগণের আকাক্সক্ষার মূল্যায়ন করেছে, যা একটি নৈতিক এবং পেশাদার নেতৃত্বসম্পন্ন সেনাবাহিনীর পরিচায়ক।
যোগ্য নেতৃত্বে পরিচালিত বলেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ একটি আন্তর্জাতিক মানের সেনাবাহিনী হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিতি লাভ করেছে। ফলশ্রুতিতে বিশ্বের সমস্যাসংকুল দেশগুলোতে জাতিসংঘের অধীনে "ব্লু হেলমেট"-এ কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করে খ্যাতি অর্জন করেছে এবং জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। একইসাথে দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
৪। নেতৃত্বে নৈতিকতার ভূমিকা: সিদ্ধান্ত গ্রহণে যখন নৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তখন সঠিক পথ বেছে নেওয়াই একজন প্রকৃত নেতার প্রধান পরীক্ষা। শান্তিকালীন নয় বরং সংকট মুহূর্তে একজন নেতা কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তাই নৈতিকতার নির্ধারক। সেনাবাহিনী প্রয়োজনে শক্তি ও ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে। তাই এই ক্ষমতা প্রয়োগের সঠিক মাত্রা অর্থাৎ ক্ষমতার সঠিক প্রয়োগ বা অপপ্রয়োগের সীমারেখা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা একজন কমান্ডারের নৈতিক অবস্থানের পরিচায়ক। সৈনিক তার জীবনকে তুচ্ছ করে তার কমান্ডারের আদেশ মান্য করে। তাই কমান্ডারকে হতে হয় তার অধীনস্থদের প্রতি মানবিক এবং ন্যায়বিচারক। একজন কমান্ডার অধীনস্থদেরকে যতটুকু অপরাধীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবে, তার থেকে বেশি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করবে, তবেই শুধু অধীনস্থরা তাদের সবচেয়ে মূল্যবান জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকবে। নৈতিকতা ও বিচক্ষণতার মাপকাঠি দিয়ে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে পারলে নেতৃত্বের প্রতি দৃঢ় আস্থা ও আনুগত্য তৈরি করা যায়। সততা ও নৈতিকতার প্রশ্নে একজন সেনা কমান্ডার নিজেকে অধীনস্থদের সামনে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অধীনস্থ সদস্যদের কল্যাণ, জীবনমান, আর্থিক নিরাপত্তা, আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন এবং কমান্ডার ও অধীনস্থদের পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার মাধ্যমে সদস্যদের আত্মমর্যাদা ও পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের প্রতি সেনাসদস্যদের আস্থা, দায়িত্ববোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্য আরও সুদৃঢ় হয়েছে। দেশের বিভিন্ন সংকটময় সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দায়িত্বশীলতা, বিচক্ষণতা ও নৈতিক অবস্থান বজায় রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলেই জাতীয় নিরাপত্তা ও জনকল্যাণে এই বাহিনীর ভূমিকা জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।
৫। সামরিক পেশাদারিত্বের নিয়ামক: পেশাদারিত্বের একটি অন্যতম উপাদান হলো দক্ষতা, যা অর্জন করতে হয় প্রশিক্ষণ বা শিক্ষার মাধ্যমে। পেশাগত জ্ঞান একজন কমান্ডারের একটি অপরিহার্য গুণাবলি। সঠিক পেশাগত জ্ঞান থাকলেই একজন কমান্ডার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, আর তা অর্জন করতে হয় ক্রমাগত জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে। সামরিক শৃঙ্খলায় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য এবং চেইন অব কমান্ড অনুসরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি পেশাদার সেনাবাহিনী রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থেকে শুধু দেশের সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে।
বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিতে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র এই প্রযুক্তিগত প্রভাবের বাইরে নয়। একজন পেশাদার সেনা নেতৃত্বকে প্রযুক্তির উপর যেমন দখল থাকতে হবে, তেমনি প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য তার অধীনস্থদের প্রস্তুত করতে হবে। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিকে যথাযথ ও কার্যকরভাবে ব্যবহারের উপর নির্ভর করছে পেশাদারিত্বের মাপকাঠি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার সামরিক প্রশিক্ষণের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করেছে।
৬। সিভিল-মিলিটারি সম্পর্ক ও জনআস্থা: একটি গণতান্ত্রিক দেশের সেনাবাহিনী হবে জনগণের সেনাবাহিনী। তাদের প্রথম দায়িত্ব হবে নিজ দেশের জনগণের সেবা করা, সেটা যুদ্ধক্ষেত্রেই হোক আর শান্তিকালেই হোক। সেই অর্থে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নীতিবাক্য (গড়ঃঃড়) যথার্থ হয়েছে, "সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে"। এই নীতিবাক্যটি সেনাবাহিনীর যুদ্ধকালীন বীরত্ব, শান্তিকালীন অবদান এবং দেশের প্রয়োজনে যেকোনো পরিস্থিতিতে আত্মত্যাগের মানসিকতাকে ফুটিয়ে তোলে। বাংলাদেশের মতো একটি বিকাশমান গণতান্ত্রিক দেশে সেনাবাহিনীর উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় একটি পেশাদার সেনাবাহিনী গঠনে জনমত সৃষ্টিতে এবং জনগণের আস্থা অর্জন করতে সিভিল-মিলিটারি সম্পর্ক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।
একটি দেশের সেনাবাহিনীর জনবল, দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত উচ্চমানের সক্ষমতা থাকে, যা সে শান্তিকালীন সময়ে সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যেকোনো দুর্যোগকালীন মুহূর্তে জনসাধারণের কষ্ট লাঘব করতে পারে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা দৃষ্টান্তমূলক। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস, ভূমিকম্প, অগ্নিকা-, নদীভাঙ্গন, খরা, করোনা বা মহামারি ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ, পুনর্বাসন, মেরামত এবং বিনামূল্যে মেডিকেল সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে দুর্গতদের সেবা প্রদান করে সাধারণ জনগণের মাঝে আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ এবং ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ (ওহ অরফ ঃড় ঈরারষ চড়বিৎ) নীতিমালার আওতায় সুষ্ঠু নির্বাচনে সহায়তা, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জাতি গঠনমূলক কর্মকা-ে বেসামরিক প্রশাসনকে ব্যাপক সহযোগিতা প্রদান করে যাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের অবকাঠামো ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। পদ্মা সেতু প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং বিভিন্ন রাস্তা-সেতু নির্মাণসহ, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও উন্নয়ন, ন্যাশনাল আইডি কার্ড ও ই-পাসপোর্ট প্রস্তুত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নৈতিক ও পেশাদারী নেতৃত্বের প্রভাবেই এই সফলতা এসেছে এবং জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
৭। সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ: প্রথাগত যুদ্ধের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য বেশ কিছু আধুনিক ও অপ্রথাগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। অরাষ্ট্রীয় শক্তির (ঘড়হ-ংঃধঃব অপঃড়ৎং) উত্থান এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে বিদেশি স্বার্থের অপতৎপরতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ডিজিটালাইজড ব্যবস্থাকে সাইবার হ্যাকিং সহ সেনাবাহিনী বা রাষ্ট্রীয় তথ্য চুরির চেষ্টা থেকে সুরক্ষা দেওয়া জরুরী। এছাড়া তথ্যযুদ্ধ ও প্রোপাগান্ডার অংশ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও) ব্যবহার করে সেনাবাহিনী বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করার অপচেষ্টা থেকে নিরাপদ থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি বহুবিধ সমস্যাসম্বলিত দেশে সেনাবাহিনীর জন্য দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলার মতো অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
৮। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও শিক্ষণীয় দিক: উন্নত দেশসমূহ সামরিক বাহিনীতে নৈতিকতা (গরষরঃধৎু ঊঃযরপং) কঠোরভাবে চর্চা করে, যা আন্তর্জাতিক আইন (খধি ড়ভ অৎসবফ ঈড়হভষরপঃ - খঙঅঈ) এবং মানবিক আইন মেনে চলে। এই নৈতিকতা চর্চার মূল উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা এবং অপ্রয়োজনীয় সহিংসতা কমানো। যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটো (ঘঅঞঙ) বাহিনীর সৈনিকরা সামরিক অভিযানে জঙঊ (জঁষবং ড়ভ ঊহমধমবসবহঃ) অনুসরণ করে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি একাডেমি বা যুক্তরাজ্যের স্যান্ডহার্স্ট রয়্যাল মিলিটারি একাডেমিতে সৈনিকদের শুধু অস্ত্র চালনাই শেখানো হয় না, বরং যুদ্ধের নৈতিকতা (ঊঃযরপং ড়ভ ডধৎ) বা ‘জাস্ট ওয়ার থিওরি’ (ঔঁংঃ ডধৎ ঞযবড়ৎু) বিষয়ে পাঠ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাতিক পরিম-লে পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশের সেনাবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ দায়িত্ব পালন করছে। সেখানে সত্যিকারের সশস্ত্র যুদ্ধ পরিস্থিতির সাথে মোকাবিলা করে আন্তর্জাতিক মানের সামরিক নৈতিকতার জ্ঞান অর্জন এবং চর্চা করে থাকে। জাতিসংঘের অধীনে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশসমূহে শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সফলতাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক মানের সামরিক নৈতিকতার উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। এছাড়া বাংলাদেশের দক্ষ ও বাছাই করা সেনা অফিসারগণ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত ও পাকিস্তানসহ পৃথিবীর উন্নত ও সামরিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর আন্তর্জাতিক মানের সামরিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত হয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
৯। নেতৃত্ব উন্নয়নে সুপারিশ: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পেশাদারিত্বের পাশাপাশি নৈতিকতার মান সমুন্নত রাখা এবং উত্তরোত্তর উন্নতির জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারেঃ
ক। প্রশিক্ষণে নৈতিকতা ও নেতৃত্ব উন্নয়ন বিষয়ক পাঠদান জোরদার।
খ। দায়িত্ব পালনে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি।
গ। প্রযুক্তি ও আধুনিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তকরণ।
ঘ। নেতৃত্বে মেধা, পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
ঙ। পরিবার ও সামাজিক মূল্যবোধের উন্নয়ন।
১০। উপসংহার: বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার জন্মলগ্ন থেকে নৈতিকতা, পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের সমন্বয়ে জনসাধারণের আস্থা ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। শুধুমাত্র সামরিক দক্ষতা নয়, বরং সততা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা, জবাবদিহিতা এবং সাংবিধানিক আনুগত্যের সমন্বয়ই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্বাধীনতা যুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ে জাতীয় নিরাপত্তা, দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে তার নৈতিক ও পেশাদার নেতৃত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ, তথ্যযুদ্ধ, সাইবার হুমকি এবং অভ্যন্তরীণ-বাহ্যিক বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীকে আরও আধুনিক, জ্ঞানভিত্তিক ও নৈতিকভাবে দৃঢ় হতে হবে। নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের এই যুগপৎ চর্চা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভবিষ্যতেও দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক, জনগণের আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল এবং আন্তর্জাতিক পরিম-লে একটি সম্মানিত ও আধুনিক বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে।
লেখক পরিচিতি
বিএ-৫৯৪৭ কর্নেল মোহাম্মদ সুরুজ মিয়া, বিজিবিএম, পিএসসি
সেক্টর কমান্ডার, বিজিবি ঠাকুরগাঁও সেক্টর





