মাদক কারবারিদের সশস্ত্র দাপটে পুলিশসহ আহত চারজন

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:৩০ অপরাহ্ন, ১৫ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৯:০১ অপরাহ্ন, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদক কারবারি ও কিশোর অপরাধী চক্রের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চললেও অনেক এলাকায় তাদের সংঘবদ্ধ সশস্ত্র তৎপরতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে। এরই ধারাবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পুলিশের অভিযানের সময় মাদক কারবারিদের সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে গুলিবিদ্ধ একজনসহ চারজন আহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে গুলিভর্তি একটি পিস্তলসহ দুজনকে আটক করেছে পুলিশ।

শনিবার (১৫ আগস্ট) বেলা ৩টার দিকে ফতুল্লার ইসদাইর রেললাইন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ফতুল্লা মডেল থানার পুলিশ বলছে, মাদক কারবারিদের একটি সশস্ত্র দল এলাকায় অবস্থান নিয়ে গোলাগুলি করছে—এমন খবরের ভিত্তিতে অভিযান চালানোর সময় পুলিশের ওপর গুলি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আত্মরক্ষার্থে পুলিশও গুলি চালায়।

আরও পড়ুন: জুলাইয়ে ডিএমপির সেরা বিভাগ মিরপুর, শ্রেষ্ঠ থানা মিরপুর

আটক দুজন হলেন ইসদাইর এলাকার রাজ্জাকের ছেলে জসিম (২৪) ও আব্দুস সালামের ছেলে মোহন (২৩)। পুলিশের দাবি, আটকের সময় জসিমের কাছ থেকে গুলিভর্তি একটি পিস্তল জব্দ করা হয়েছে। তার পায়ে গুলির আঘাত রয়েছে। তাকে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

অভিযানে ফতুল্লা থানার এসআই মো. রফিক, এসআই বন্ধন চন্দ্র সরকার ও কনস্টেবল রাশেদুল আহত হয়েছেন। তাদেরও হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: ১৫ আগস্ট কেন্দ্র করে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা পুলিশের

পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ও ইটপাটকেল: 

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসদাইর রেললাইন এলাকায় মাদক কারবারিদের একটি দল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান করছে এবং নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গোলাগুলি করছে—এমন তথ্য পেয়ে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশের একটি দল সেখানে যায়।

পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরই তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয় বলে পুলিশের দাবি। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায় এবং পরে ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে আটক করে।

ফতুল্লা মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মাহবুব আলম বলেন, “পরিস্থিতি সামাল দিতে আত্মরক্ষার্থে পুলিশও গুলি করে। পরে ধাওয়া দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে আটক করা হয়।”

পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পায়ে গুলির আঘাত, জব্দ পিস্তল: 

নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক অপু কুমার সাহা জানান, বেলা পৌনে ৪টার দিকে জসিমকে হাসপাতালে আনা হয়। তার পায়ে দুটি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এগুলো গুলির আঘাত বলে জানানো হয়েছে। গুলি শরীরের ভেতরে রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে তাকে এক্স-রে করতে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে জসিমের কাছ থেকে একটি গুলিভর্তি পিস্তল জব্দ করা হয়েছে। অস্ত্রটির বৈধতা এবং সেটি কীভাবে তার কাছে এলো, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ ঘিরে পুরোনো বিরোধ: 

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইসদাইর এলাকায় মাদক ব্যবসা ও কিশোর অপরাধী চক্রকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজ্জাক এবং তার দুই ছেলে জসিম ও ওয়াসিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে মাদকবিরোধী অভিযানে ৫৩ রাউন্ড গুলিসহ রাজ্জাক ও তার ছোট ছেলে মো. ওয়াসিমকে (২২) গ্রেপ্তার করা হয়। এর কয়েক দিন আগে ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্রসহ জসিমকেও গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।

পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সম্প্রতি তারা জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় ফিরে আসেন। এরপর ফের এলাকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা শুরু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় আরেক মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত শাকিলের সঙ্গে তাদের বিরোধ তৈরি হয় বলেও জানিয়েছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।

তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

৭ আগস্টও দুই পক্ষের গোলাগুলি: 

স্থানীয় চারজন বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৭ আগস্ট ইসদাইর এলাকায় মাদক কারবারিদের দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পরও এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এর মধ্যেই শনিবার ফের অস্ত্রের ব্যবহার ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের বিরোধের কারণে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে। রেললাইন ও আশপাশের এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া এবং সংঘর্ষের ঘটনায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নতুন উদ্বেগ: 

ফতুল্লার ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন গোলাগুলির ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র, কিশোর অপরাধী চক্র এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের পারস্পরিক যোগসূত্র আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

অপরাধী চক্রগুলো যখন মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময়ও প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস দেখায়, তখন এসব চক্রের অর্থের উৎস, অস্ত্রের সরবরাহ এবং রাজনৈতিক বা স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

বিশেষ করে জামিনে মুক্তির পর অভিযুক্তদের পুনরায় একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি অপরাধীদের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘পুলিশের ওপর হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে’: 

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বলেন, “পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে। ইসদাইর এলাকার মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারেও পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

পুলিশ জানিয়েছে, আটক দুজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকসহ সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা প্রক্রিয়াধীন। একই সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক ব্যবসা ও সশস্ত্র অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু অভিযান পরিচালনা নয়—মাদক কারবারের মূলহোতা, অর্থের উৎস, অস্ত্র সরবরাহকারী এবং পেছনের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।

কারণ, মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে যখন প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে, তখন তা কেবল মাদকবিরোধী অভিযানের বিষয় নয়; এটি সরাসরি জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।