তেল সংকটে দিন দিন থমকে যাচ্ছে রাজধানী: দীর্ঘ লাইন, রেশনিং আর বিশৃঙ্খলায় জনজীবন জিম্মি
রাজধানীজুড়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট জনজীবনে নেমে এনেছে নজিরবিহীন ভোগান্তি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পাওয়া, অঘোষিতভাবে সরবরাহ সীমিত করা এবং হঠাৎ পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় চরম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে চালকদের মধ্যে। সড়কজুড়ে দীর্ঘ যানবাহনের সারিতে নগরজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি যখন সংকটের তীব্রতা স্পষ্ট করছে, তখন সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার সরকারি দাবি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, শ্যামলী, কল্যাণপুর ও টেকনিক্যাল সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশন ঘিরে তৈরি হয়েছে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারি। এসব লাইন ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের অলিগলিতেও, ফলে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়ে জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে।
আরও পড়ুন: জুরাইন-শ্যামপুরে ডিএসসিসির উচ্ছেদ অভিযান, জরিমানা আদায় ২৩ হাজার টাকা
আগারগাঁওয়ের একটি ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, সরবরাহ শুরু হওয়ার আগেই ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ক্রেতারা। সরবরাহ শুরু হলেও অল্প সময়েই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে, ফলে অনেকেই খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।
রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই জ্বালানি সরবরাহে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোথাও মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা, আবার কোথাও ৬০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না।
আরও পড়ুন: গুলশানের আলোচিত বাড়ি সরকারের সম্পত্তি, তিন মাসের মধ্যে ছাড়তে হবে সালাম মুর্শেদীকে
এক ভুক্তভোগী চালক (ছদ্মনাম: আরিফ হোসেন) বলেন, রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ তেল পাচ্ছি না। কেন কম দেওয়া হচ্ছে—এর কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যাও নেই।
আরেক চালক (ছদ্মনাম: সোহেল রানা) জানান, “৬-৭ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর এত কম তেল পাওয়া খুবই হতাশাজনক। এতে সময় ও শ্রম দুটোই নষ্ট হচ্ছে।”
পরীবাগসহ কয়েকটি এলাকায় ফিলিং স্টেশনে তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় পাম্প বন্ধ রাখতে দেখা গেছে। অন্যদিকে চালু থাকা পাম্পগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে গিয়ে মাঝেমধ্যে সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
এক বিক্রয়কর্মী (ছদ্মনাম: মিজানুর রহমান) জানান, “চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দ্রুত তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে লাইনে থাকা মানুষদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কিছু পাম্পে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সরকারি পক্ষ থেকে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। দীর্ঘ লাইন, সীমিত সরবরাহ এবং পাম্প বন্ধ থাকার ঘটনা সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকায় অতিরিক্ত ভিড়ের পেছনে ‘প্যানিক বায়িং’ দায়ী হলেও, ভুক্তভোগীরা বলছেন—নিশ্চয়তা না থাকায়ই তারা আগেভাগে লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে ক্রুড অয়েল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটেছে বলে জানা গেছে। দেশের একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) সীমিত সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানিবাহী জাহাজ ভিড়লেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহে চাপ এখনো কাটেনি।
বর্তমান সংকটে—কর্মঘণ্টা ব্যাপকভাবে নষ্ট হচ্ছে, পণ্য ও যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে জাতীয় উৎপাদনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে। মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর সভা-সেমিনারে ভার্চুয়াল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমানো যায়।
রাজধানীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মোটরসাইকেলের জন্য চালু হওয়া এই ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে অন্যান্য যানবাহনে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে সরবরাহ সংকট নিরসন ছাড়া এ উদ্যোগ তেমন কার্যকর হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি তেলের চলমান সংকট এখন রাজধানীর জনজীবনে এক গভীর অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ভোগান্তি আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে—এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট সবার।





