মাদক বিরোধী অভিযানে আরো কঠোরতা
অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় মদ পার্টিতে আটক ৮৫ যুবক-যুবতীকে কারাদণ্ড
মাদকবিরোধী অভিযানে সরকারের আরও কঠোরতায় অতিরিক্ত ডিআইজির বাসা থেকে আটক উচ্চবিত্তের ৮৫ যুবক-যুবতীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে মেট্রোপলিটন স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট। তাদের কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। অভিযানের পর থেকে সেনা, পুলিশ, রাজনৈতিক ও উচ্চবিত্তের সন্তান আটক হওয়ায় তাদের পক্ষ থেকে তদবির করেও রক্ষা হয়নি। এমনকি আইনি কাঠামোর মধ্যেই আমারই ট্রায়াল তাদের দ্রুত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের ঘনিষ্ঠরা জানায়, এটি সমাজের জন্য সরকারের একটি দৃষ্টান্তমূলক বার্তা।
গত মঙ্গলবার রাতে ৩০০ ফিট সড়কের পাশে পুলিশ হাউজিং সোসাইটি-১-এর একটি ভাড়া বাসায় ডিবি অভিযান চালিয়ে ৮৫ জনকে আটক করে। এই বাড়ির মালিক পুলিশ হেডকোয়ার্টারে অতিরিক্ত ডিআইজি (আব্দুল্লাহ আল জহির)। পুলিশ হাউজিংয়ে নিরাপদ এলাকার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই বাড়িতে অসামাজিক কার্যকলাপ, মাদক ব্যবসার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ডিবি পুলিশ সাঁড়াশি অভিযান চালায়। পুলিশ হেডকোয়ার্টারের অতিরিক্ত ডিআইজির বাড়িতে অভিযান থামাতে কোনো তদবির কাজে আসেনি। অভিযানে ডিবি এবং সরকার কঠোর ভূমিকা নেয়।
আরও পড়ুন: গুলিস্তানে বোমা ভেবে আতঙ্ক, তল্লাশিতে মিলল পচা ফল ও কাপড়
এখানে আটকরা কেউ আমজনতা নয়। আটকরা প্রায় সবাই এলিট ঘরানার। সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সন্তান, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সন্তান, রাজনৈতিক পরিচয়ের লোকজন, ব্যবসায়ীসহ এলিট সোসাইটির লোকজন আটক হয় এই অভিযানে।
আটক ৮৫ জনের মধ্যে ৫৯ জন পুরুষ, ১৬ জন মহিলা। ডিবি সূত্রে জানা যায় যে, অভিযানে বাসাটি থেকে গাঁজা, ইয়াবা, মদ ও ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। তিনতলা এই বাড়িতে নিয়মিত মাদক সেবন ও ডিজে পার্টি চলত। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম মিডিয়ার নিকট জানান যে, অতিরিক্ত ডিআইজি অনলাইনের মাধ্যমে বাড়িটি ভাড়া দিয়েছিলেন। যারা ভাড়া নিয়েছেন তারা মাদকসংক্রান্ত কাজে বাড়িটি ব্যবহার করত।
আরও পড়ুন: ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শন
এই ঘটনায় আসামিদেরকে জনাব আসাদুজ্জামান, ভারপ্রাপ্ত স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, গুলশান জোনের আদালতে বুধবার উপস্থাপন করা হলে আদালত মামলা গ্রহণ করে সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে ৮৫ জনকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দণ্ড প্রদান করেন। ৫৯ জন পুরুষ আসামি প্রত্যেককে ৩০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড তৎসহ প্রত্যেককে ১০০০/- টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ৫ দিনের কারাদণ্ড। ১৬ জন মহিলা প্রত্যেককে ১৫ দিনের কারাদণ্ডসহ প্রত্যেককে ৫০০/- টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও ৩ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন।
সমাজের নিরাপদ এলাকাগুলোতে ঘটে যাওয়া অপরাধের ঘটনা সহসাই আইনের আওতায় আসে না। আবার এসব ঘটনায় এলিট শ্রেণির লোকজন আটক হলে তদবির-তাগাদা করে ছাড়া পেয়ে যায় বা কোনো মামলা হলে জামিন, তদন্তের মাঝে বিচারপ্রক্রিয়া হারিয়ে যায়। ফলে অপরাধের ঘটনা অনেক হলেও দণ্ড হওয়ার ঘটনা খুবই সীমিত সংখ্যক। অপরাধ ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের সামনে উপস্থাপন এবং সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে বিচার—এই বিধান অনেক আগে থেকেই আইনে থাকলেও এর প্রয়োগ ছিল না। অথচ বাংলাদেশের মতো এত ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সামারি ট্রায়াল করা খুবই জরুরি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রত্যেক বিভাগে ১টি করে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট চালু আছে। এসব কোর্টে একজন করে আইন-কানুন ও বিচারিক কাজে অভিজ্ঞ দক্ষ বিচারকগণ বিচারকার্য পরিচালনা করেন। সামারি ট্রায়ালের এখতিয়ারের আওতায় সংঘটিত অপরাধের ঘটনায় আসামিদেরকে পুরাতন ঢাকায় অবস্থিত কোর্টে নেওয়া হয় না এবং দিনের পর দিন বিচারের জন্য সময়ক্ষেপণ হয় না। উত্তরের ঘটনার বিচার উত্তরায়ই শেষ, মিরপুরের ঘটনার বিচার মিরপুরেই শেষ এবং অপরাধের বিচার এক দিনে হওয়ায় সাজার হার সর্বোচ্চ পরিমাণ। একই সঙ্গে ট্রাফিকসংক্রান্ত লক্ষাধিক মামলা এই আদালতগুলোতে দ্রুততার সঙ্গে শেষ হচ্ছে।
অনেক বিদ্যমান সমস্যার মধ্যেও বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর ভূমিকা পালন করছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টারে কর্মরত একজন অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় পুলিশের অভিযান এই উদাহরণ খুবই বিরল। এই ঘটনায় উক্ত অতিরিক্ত ডিআইজিকে ইতোমধ্যে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের এই কঠোর ভূমিকা এবং সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার প্রদান সমাজে অপরাধপ্রবণতাকে কমিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।





