রাজনৈতিক দলগুলোর মিশ্র প্রতিক্রিয়া
ঋণ নির্ভর বাজেট, আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য চ্যালেঞ্জ : ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো ও সিপিডিসহ বিভিন্ন সংগঠন। সরকার ঘোষিত নতুন এই বাজেটকে বিরোধী ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবায়ন নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মন্তব্য করেছে।
ঋণ নির্ভর বাজেট আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় সংসদ থেকে বাজেট অধিবেশনে থেকে বের হয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাজেটে বৈদেশিক ঋণের ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভরতা এবং বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যা ভবিষ্যতে আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বাজেটের মূল সাফল্য নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। তিনি বলেন, মানবিক অর্থনীতি গড়ার চেষ্টার কথা বলা হয়েছে, সেজন্য বিভিন্ন বরাদ্দ উল্লেখ আছে। যুব সমাজ, পিছিয়ে পড়া মানুষ, এদের কথাও একই সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সরকার অর্থনৈতিক নীতি কাঠামোকে বাস্তবায়ন করার জন্য যে আর্থিক কাঠামো সেটা অত্যন্ত দুর্বল। আর্থিক কাঠামো যেটা করা হয়েছে তার ভেতরে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক বিলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তাটা সেই জন্য কারণ, অনেক ক্ষেত্রে বড় বড় ধরনের থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাজেটে উদারীকরণ, মানবিক অর্থনীতি গঠন এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে নীতিগতভাবে শক্তিশালী এই কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ভিত্তি যথেষ্ট দৃঢ় নয় বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, বাজেটে বৈদেশিক ঋণের ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভরতা এবং বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। ফলে বাজেটের মূল সাফল্য নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। তিনি আরও বলেন, সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সরকার কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারে, সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার বিষয়।
আরও পড়ুন: চাল-ডাল থেকে ক্যামেরা, ৬০ পণ্যের দাম কমানোর পরিকল্পনা বাজেটে
২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের বাজেট পেশের প্রতিক্রিয়ায় রাজধানীর উত্তরা বাড্ডায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর। মিছিলের পূর্বে উত্তর বাড্ডা ওভার ব্রিজের নিচে আয়োজিত সমাবেশ কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ইয়াসিন আরাফাতের পরিচালনায় এতে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দীন মোল্লা ও ডা.ফখরুদ্দিন মানিক।উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও প্রচার-মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার নোমান আহমেদি, মাওলানা কুতুবউদ্দিন, ফজলে আহমেদ প্রমুখ। বিক্ষোভ মিছিল উত্তর বাড্ডা থেকে শুরু হয়ে গুলশান লিংক রোডে এসে শেষ হয়। বাম গণতান্ত্রিক দলসমূহ (বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি) মনে করে, নতুন বাজেটে জনপ্রত্যাশার আধা-আধি প্রতিফলন রয়েছে বলে দলটি মত দিয়েছে। বিশাল ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপের কথা উল্লেখ করে তারা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছে।
প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়: আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে বাজেট উপস্থাপন করেছেন তা বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী। আর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেছেন, লুটেরা ধনিক শ্রেণির স্বার্থের এই বাজেট ‘বাস্তবায়ন করা কঠিন’। বৃহস্পতিবার বিকালে জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আরও পড়ুন: ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন,এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য না, বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা কখনোই অর্জন হবে না। ফলে সরকার ডেভেলপমেন্ট বাজেট এডিপি থেকে ঋণ করে করবে, বেতন, সরকারি রেভিনিউ বাজেটও দেখা যাবে লোনের ভিত্তিতে হবে। এটা অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে; পাশাপাশি যদি বেতন বাড়ানো হয়, পে-স্কেল ইমপ্লিমেন্ট হয়, বেসরকারি খাতকে কিন্তু চাপে ফেলবে। প্রচণ্ড মুদ্রা স্মৃতি হওয়ার সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাচ্ছি। মুদ্রা স্মৃতি নিয়ন্ত্রণের কোনো নির্দেশনা বাজেটে নাই। কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঠিক নির্দেশনা নাই। তিনি বলেন, চর এলাকার মানুষদের জন্য যাদেরকে আমরা চর ফাউন্ডেশন করা উচিত বা চর এলাকার যে ভাগ্য উন্নয়ন সেটার জন্য এখানে কোনো নির্দেশ নাই, বরাদ্দ কম দেওয়া হয়েছে। আরো অনেক বেশি বরাদ্দ দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, এত বড় বাজেট আমাদের দেশের জন্য প্রযোজ্য না। এর মধ্যে প্রায় আড়াইল লক্ষ কোটি টাকা ঘাটতি বাজেট দেখানো হচ্ছে। এই টাকাটা তো আমাদের সাধারণ মানুষের উপর থেকে কর নিয়ে সেটা করা হবে। যদিও বাজেটে বলা হয়েছে যে, নিত্যপণ্যে দাম কমবে; কিন্তু বাংলাদেশের দাম তো কখনো কমে না এবং ওই ঘোরাফেরা আমদানিকারক ব্যবসায়ী, তাদেরকে সুবিধা আবার দেওয়া হয়েছে। চন্দন বলেন, এই বাজেটে আমাদের শ্রমিকের মজুরি, ন্যূনতম মজুরি কত হবে? তারপরে কৃষকের এই যে সমবায় কিংবা এই যে কোল্ড স্টোরেজ কিংবা হিমাগার কিংবা ধানের দাম কীভাবে নির্ধারণ হবে, এই বিষয়গুলো তো সুস্পষ্ট হয় নাই। এই বাজেটে। আমাদের কর্মসংস্থানের কোনো চিন্তাভাবনা তো এভাবে নাই। তিনি বলেন, কোটি কোটি বেকার, সেই বেকারত্ব কীভাবে দূর হবে, সেই কথা তো বাজেটে উল্লিখিত হয় নাই। সার্বিকভাবে ঘুরে ফিরে অতীতে সরকারগুলো যে ধরনের বাজেট তৈরি করছে। ধনিক শ্রেণির স্বার্থে, লুটেরা ধনিক শ্রেণির স্বার্থে এবারও বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। মূল কথা হচ্ছে, এটা বাস্তবায়ন করা কঠিন।
অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক ও সামাজিক দলসমূহ: সামগ্রিক বাজেটকে অনেকটাই ‘স্বপ্নবিলাসী’ বলে আখ্যায়িত করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য-জ্বালানি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়ার কথা বলা হলেও, তা কতটা অর্জিত হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।





