প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের পর বিডার নানামুখী উদ্যোগ

বিশ্ব হালাল অর্থনীতির শক্ত অবস্থানে যাচ্ছে দেশ

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৫:০৫ অপরাহ্ন, ০২ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৫:০৫ অপরাহ্ন, ০২ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

তিন ট্রিলিয়ন ডলারের বিশ্ব হালাল অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থানে যেতে বাংলাদেশের নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে হালাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা হয়েছে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বাংলাদেশ থেকে হালাল পণ্য রপ্তানি বাড়াতে বাণিজ্য ও শিল্প উন্নয়নে তৎপর হয়েছে। হালাল সনদের সমস্যা সমাধান এবং কৃষিভিত্তিক অন্যান্য রপ্তানিতে জোর দেওয়া হয়েছে।

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতির বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এবং বাংলাদেশের হালাল শিল্পের বিকাশে মালয়েশিয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগাতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে।

আরও পড়ুন: কমলো এলপিজির দাম

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মালয়েশিয়া সফরেও হালাল শিল্পকে দুই দেশের সম্ভাবনাময় সহযোগিতার অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সে ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের উদ্যোগে বিষয়টি আরও অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হালাল শিল্প কেবল খাদ্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম, যার মধ্যে রয়েছে—হালাল খাদ্য ও পানীয়, ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যালস, প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা, মডেস্ট ফ্যাশন, ইসলামিক ফাইন্যান্স, হালাল লজিস্টিকস, মুসলিমবান্ধব পর্যটন, হালাল হোটেল ও হাসপাতাল ও চিকিৎসা পর্যটন।

আরও পড়ুন: আবার সোনার দাম ভরিতে বাড়ল ২ হাজার ২১৬ টাকা

অর্থাৎ কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিপণন এবং ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ইসলামী শরিয়াহসম্মত মান নিশ্চিত করেই একটি পণ্য বা সেবাকে হালাল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

বিশ্বে মালয়েশিয়ার নেতৃত্ব

হালাল শিল্পে মালয়েশিয়াকে বিশ্বের অন্যতম সফল দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গত চার দশকে দেশটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা, গবেষণা, নীতিমালা ও শিল্প অবকাঠামো গড়ে তুলেছে।

দেশটির সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের হালাল বাজারের আকার ১১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে। এর মধ্যে খাদ্য ও পানীয় খাতই হবে সবচেয়ে বড় অংশ।

মালয়েশিয়ার হালাল শিল্পের মূল খাতগুলো হলো—ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, কসমেটিকস, ফার্মাসিউটিক্যালস, ইনগ্রিডিয়েন্টস, মডেস্ট ফ্যাশন, মেডিকেল ট্যুরিজম, মুসলিম-ফ্রেন্ডলি হাসপাতাল, লজিস্টিকস, ইসলামিক ফাইন্যান্স।

দেশটির হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা পরিচালনা করে সরকারি সংস্থা জাকিম (JAKIM) এবং শিল্প উন্নয়নে কাজ করে হালাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (HDC)।

কীভাবে নিশ্চিত হয় হালাল সনদ?

মালয়েশিয়ায় একটি পণ্যকে হালাল সনদ দেওয়ার আগে কয়েকটি ধাপে কঠোর যাচাই করা হয়—কাঁচামালের উৎস, উৎপাদন প্রক্রিয়া, প্যাকেজিং, সংরক্ষণ, পরিবহন সরবরাহ ব্যবস্থা। প্রতিটি ধাপে শরিয়াহ ও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা তা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়।

বাংলাদেশের সম্ভাবনা

বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক হালাল বাজারে প্রবেশের বড় সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে—কৃষিপণ্য, মাছ ও মাংস, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, তৈরি পোশাক, প্রসাধনী। এসব পণ্যের বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৮৫ কোটি ডলারের হালাল পণ্য রপ্তানি করে, যার বড় অংশ কৃষিভিত্তিক।

ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করা গেলে কয়েক বিলিয়ন ডলারের নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা।

বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআই—উভয় প্রতিষ্ঠান হালাল সনদ প্রদান করছে। তবে আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার, পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং একক সার্টিফিকেশন কাঠামোর অভাবে অনেক রপ্তানিকারককে বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে সনদ নিতে হচ্ছে।

খাদ্য, ওষুধ ও মাংসজাত পণ্য রপ্তানিতে আধুনিক পরীক্ষাগার, মানসম্মত জবাইখানা এবং সমন্বিত হালাল অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার হালাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (HDC)-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে। লক্ষ্য হচ্ছে—আন্তর্জাতিক মানের হালাল শিল্প গড়ে তোলা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, হালাল রপ্তানি বৃদ্ধি, সার্টিফিকেশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সম্প্রসারণ, সামনে যে সুযোগ।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিএমসিসিআই) জানিয়েছে, মালয়েশিয়া প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের হালাল খাদ্য আমদানি করে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজার ৫০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ নীতিমালা, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার, সমন্বিত সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক তিন ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।