অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার দুর্নীতির অভিযোগ: তদন্তের দাবি, সংসদে নতুন বিতর্ক

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৭:১২ অপরাহ্ন, ২৯ জুন ২০২৬ | আপডেট: ৭:১২ অপরাহ্ন, ২৯ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানিয়ে জাতীয় সংসদে নতুন রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের উল্লেখ করে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে সংঘটিত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) দায়িত্ব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে উপস্থিত ছিলেন এবং সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।

আরও পড়ুন: চাকরির জন্য তরুণদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না: সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

তবে সরকারের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, সংসদে বিষয়টি আলোচিত হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি।

টিআইবির প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ

আরও পড়ুন: লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতি, তবে কিছু এলাকায় ঘাটতি থাকবে: বিদ্যুৎমন্ত্রী

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, টিআইবির প্রতিবেদনে দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। তাই স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদক চাইলে বিষয়টি তদন্ত করতে পারে।

এদিকে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, 'জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫'-এ সেবা খাতে দুর্নীতির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। তার ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি থাকায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কমিশনে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে তা আইন অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করা হবে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

আসিফ মাহমুদের প্রতিক্রিয়া

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। তবে তার দাবি, বর্তমান সরকার চার মাস ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যকরভাবে পরিচালনার সুযোগ দেয়নি।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকারের সময়কাল—সব সময়ের অভিযোগই নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। জেলা পর্যায় পর্যন্ত দুর্নীতির অভিযোগ যাচাই করা প্রয়োজন।

সংসদে কী বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সংসদে দেওয়া বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতির অভিযোগ সবচেয়ে বেশি এসেছে এবং সেই সময়ের ঘটনাগুলোও তদন্তের বাইরে থাকতে পারে না।

তিনি বলেন, "করাপশন কোথায় হয়েছে, কীভাবে হয়েছে এবং কারা করেছে—সবকিছু বের হওয়া উচিত। টিআইবির প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করতে পারে।"

যদিও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য আসেনি।

টিআইবির প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে

টিআইবির 'জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫' অনুযায়ী, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেবা খাতে দুর্নীতির হার ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৫টি পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, এক বছরে বিভিন্ন সেবা খাতে প্রায় ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে।

জরিপে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে উঠে এসেছে পাসপোর্ট, বিআরটিএ, বিচারসেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং ভূমি খাত। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৬ শতাংশের বেশি মানুষ জানিয়েছেন, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গ্রামাঞ্চলের মানুষ তুলনামূলক বেশি ঘুষের শিকার হলেও শহরাঞ্চলে ঘুষের পরিমাণ বেশি। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের তুলনায় বেশি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে।

দায় নিয়ে বিতর্ক

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশে দুর্নীতি দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও এই জরিপে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। ফলে সেই সময়ের সরকারেরও দায় রয়েছে।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, টিআইবির প্রতিবেদনে মূলত তৃণমূল পর্যায়ের দুর্নীতির চিত্র এসেছে এবং দুর্নীতির যে বৃদ্ধি দেখা গেছে, তা মূল্যস্ফীতির তুলনায় খুব বেশি নয়।

আগেও উঠেছিল দুর্নীতির অভিযোগ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কয়েকজন উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও সহকারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত শুরু করেছিল দুদক।

এর মধ্যে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস 'নগদ'-এর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং প্রায় ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত আলোচনায় আসে। পাশাপাশি কয়েকজন উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও সহকারীর বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল।

এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পাওয়া কিছু ছাত্র প্রতিনিধির বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার দুর্নীতির অভিযোগ আবারও আলোচনায় এসেছে। তবে সরকার এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দেয়নি।

অন্যদিকে টিআইবি মনে করছে, অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সময়ের একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা প্রয়োজন। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদও সব সরকারের সময়কার দুর্নীতির অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা