দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ২৮তম 'গণ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস' উদযাপন
সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে (গবি) দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ২৮তম 'গণ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস' উদযাপিত হয়েছে। এ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪০জন মেধাবী ও অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান করা হয়।
শনিবার (১১ জুলাই) সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাদামতলায় বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন। উদ্বোধন শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বেরিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে শেষ হয়।
আরও পড়ুন: বন্যা পরিস্থিতিতে ১৬ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের পিএইচএ মিলনায়তনে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেনের সভাপতিত্বে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মো. ফুয়াদ হোসেন ও ফার্মেসি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানিয়া আহমেদ তন্বীর সন্ধালনায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শিক্ষার্থীদের পক্ষে বক্তব্য দেন গণ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান। এছাড়া অনুষ্ঠানে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, শিক্ষা কার্যক্রম ও অর্জন নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
আরও পড়ুন: শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে একটি জাতিকে পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব: শিক্ষামন্ত্রী
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন ঢাকা-২০ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মো. তমিজ উদ্দিন। তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে এই এলাকাটি ছিল অনাবাদী ও জনশূন্য। বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী একটি ছোট্ট তাঁবুর মাধ্যমে এখানেই চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম শুরু করেন। পরবর্তীতে তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, অক্লান্ত পরিশ্রম ও মানবকল্যাণে নিবেদিত কর্মের মধ্য দিয়ে শিক্ষা, চিকিৎসা ও সমাজসেবায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর কর্ম, আদর্শ ও মানবিক দর্শনের আলো তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আজও ছড়িয়ে পড়ছে।'
অনুষ্ঠানের আরেক বিশেষ অতিথি ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মো. সালাউদ্দিন বাবু বলেন, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়, এটি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবসেবা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে চলার এক অনন্য ইতিহাস। বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিশ্বাস করতেন শিক্ষা ও চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়, যা আজও সমাজের জন্য দক্ষ, মানবিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।'
প্রধান অতিথি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, 'গণমানুষের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গণ বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চশিক্ষায় একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। বিশ্ববিদ্যালয়টি সত্যিকার অর্থেই গণমানুষের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিনা সেটি দেখতেই আমি এখানে এসেছি। শিক্ষা খাত আজ বিশ্বব্যাপী একটি বৃহৎ বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে এবং মেধার যথাযথ বিকাশও অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিকীকরণের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই জাতীয় পর্যায়ে একটি শুদ্ধ, মানবিক ও মানসম্মত শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'একজন শিক্ষার্থীর জীবনে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হলো শিক্ষা। গণবিশ্ববিদ্যালয় তুলনামূলক কম খরচে মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একসময় বিদেশি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে পড়তে এলেও বর্তমানে অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশমুখী হচ্ছে। এই প্রবণতা কমাতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, গবেষণা এবং কারিগরি শিক্ষার আরও প্রসার ঘটাতে হবে। দেশের শিক্ষাখাতে অলাভজনক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়িয়ে একটি উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।'
অনুষ্ঠানে সভাপতি বক্তব্যে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন বলেন, দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়েই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং সেই আদর্শ আজও সমানভাবে অনুসরণ হচ্ছে। একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম টিউশন ফিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে যেসব শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় থাকে, তারাও এখানে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।'
আলোচনা অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে ১৪০ জন মেধাবী ও অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীর মধ্যে বৃত্তি প্রদান করা হয়। পাঁচটি অনুষদের মোট ৫ জন শিক্ষার্থীর হাতে সরাসরি বৃত্তি তুলে দেন প্রধান অতিথি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এছাড়া উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, কোষাধ্যক্ষ ও বিভিন্ন অনুষদের ডিনরা অতিথিদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।
আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়। এসময় গবি ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য শিরিন হক, রেজিস্ট্রার মো. ওহিদুজ্জামান, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. সিরাজুল ইসলাম, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান, গবি ও গণস্বাস্থ্যের প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গকসু নেতৃবৃন্দ ও অন্যান্য সংগঠনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালের ১৪ই জুলাই ঢাকার অদূরে সাভারে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষা পৌঁছে দিতে প্রতিষ্ঠিত হয় গণ বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে মোট ৫টি অনুষদ এবং ১৭টি বিভাগে প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।





