কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীর হাহাকার
৪১৬ কলেজে ভর্তির কোন শিক্ষার্থী নেই
# ১৪ বছরে কলেজশিক্ষার আওতায় বেড়েছে ১,৫৫২ প্রতিষ্ঠান
# ২৫ লাখ ভর্তিযোগ্য আসনের বিপরীতে শিক্ষার্থী সাড়ে ১১ লাখ
আরও পড়ুন: নভেম্বরের প্রথমার্ধে এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের প্রস্তুতি
# কলেজশিক্ষার প্রতিষ্ঠান বেড়েছে প্রায় ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ
# উপজেলা ও থানা পর্যায়েও গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান
আরও পড়ুন: রাবি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, রাজশাহী রেলস্টেশনে ভাঙচুর
আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনামলে দেশে প্রয়োজন-চাহিদার যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়াই বেড়েছে অসংখ্য কলেজ। এতে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে উচ্চশিক্ষার ভিত্তি। দীর্ঘ এই সময়ে শহর থেকে উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত এলাকাতেও একের পর এক গড়ে উঠেছে নতুন নতুন কলেজ। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বাড়লেও সেই অনুপাতে শিক্ষার্থী না বাড়ায় কোথাও শত শত আসন খালি, আবার কোথাও একটি আসনের বিপরীতে আবেদন পড়ছে ৩০ থেকে ৩৩টি পর্যন্ত। চলতি শিক্ষাবর্ষে একাদশে ভর্তির প্রথম ধাপেই ৪১৬টি কলেজ-মাদরাসা কোনো শিক্ষার্থী পায়নি। আরও প্রায় ৮০০ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে মাত্র ১ থেকে ১০ জন।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় চাহিদা ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনা না করে বছরের পর বছর প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ফলেই শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন অসামঞ্জস্যতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) হিসাবে, ২০১০ সালে দেশে কলেজশিক্ষার আওতায় প্রতিষ্ঠান ছিল ৩ হাজার ৩২৪টি। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৮৭৬টি। অর্থাৎ ১৪ বছরে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ১ হাজার ৫৫২টি প্রতিষ্ঠান, বৃদ্ধির হার প্রায় ৪৭ শতাংশ। তবে প্রতিষ্ঠান বাড়লেও শিক্ষার মান ও চাহিদা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানেই দেখা দিয়েছে তীব্র শিক্ষার্থী সংকট। চলতি শিক্ষাবর্ষে একাদশে ভর্তির প্রথম ধাপেই ৪১৬টি কলেজ-মাদরাসা কোনো শিক্ষার্থী পায়নি। আরও প্রায় ৮০০ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী মিলেছে মাত্র ১ থেকে ১০ জন।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোথায় কত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, সেই চাহিদা যাচাই না করেই বছরের পর বছর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ফল এখন সামনে আসছে। স্থানীয় রাজনীতি, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বাণিজ্যিক স্বার্থও প্রতিষ্ঠান বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। ফলে একদিকে শত শত কলেজ শিক্ষার্থীর অপেক্ষায় রয়েছে, অন্যদিকে পরিচিত কিছু কলেজে একটি আসনের বিপরীতে আবেদন পড়ছে বহু। ব্যানবেইসের ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান’ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১০ সালে কলেজশিক্ষার আওতায় প্রতিষ্ঠান ছিল ৩ হাজার ৩২৪টি। ২০১৫ সালে তা বেড়ে হয় ৪ হাজার ১১৩টি। ২০২০ সালে ৪ হাজার ৬৯৯টি, ২০২১ সালে ৪ হাজার ৭২৯টি, ২০২২ সালে ৪ হাজার ৭৪৭টি এবং ২০২৩ সালে ৪ হাজার ৮২১টিতে পৌঁছায়। সর্বশেষ ২০২৪ সালে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৭৬টিতে। সে হিসাবে ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কলেজশিক্ষার প্রতিষ্ঠান বেড়েছে প্রায় ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ার পেছনে বিভিন্ন স্বার্থ কাজ করেছে। তিনি বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় এত বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পেছনে শুধু রাজনৈতিক কারণ নয়; স্থানীয় রাজনীতি, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং বাণিজ্যিক স্বার্থও কাজ করেছে। কোনো সচিবের এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠান করতে হবে, কোনো বড় ব্যবসায়ী বা ক্ষমতাশালী ব্যক্তির এলাকায় প্রয়োজন না থাকলেও প্রতিষ্ঠান করতে হবে-এভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। ফলে কোথাও শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক বেশি, আবার কোথাও শিক্ষার্থী আছে কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই।
২০২৪ সালের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৪ হাজার ৮৭৬ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩ হাজার ৩৬২টি কলেজ এবং ১ হাজার ৫১৪টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ। শিক্ষার স্তর বিবেচনায় এর মধ্যে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান ২ হাজার ৯২৯টি। এ ছাড়া ডিগ্রি (পাস) পর্যায়ের ১ হাজার ৫০টি, ডিগ্রি (অনার্স) পর্যায়ের ৬৯৮টি এবং মাস্টার্স পর্যায়ের ১৯৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব উচ্চতর পর্যায়ের কলেজের অনেকগুলোতেও একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে পাঠদান রয়েছে। কলেজ ও স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিস্তারে জেলাভেদে বড় পার্থক্য রয়েছে। ব্যানবেইসের ২০২৪ সালের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ ৪১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে ঢাকা জেলায়। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চট্টগ্রামে আছে ২০২টি প্রতিষ্ঠান। এরপর রাজশাহীতে ১৭৬টি, কুমিল্লায় ১৬৭টি এবং ময়মনসিংহে ১৫০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পরের অবস্থানে আছে সিলেট। এই জেলায় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৪৭টি। এছাড়া দিনাজপুর ১৩৭টি, রংপুর ১৩৩টি, বগুড়া ১২২টি ও গাজীপুর ১১৭টি, যশোরে ১১৬টি, সিরাজগঞ্জে ১১১টি, টাঙ্গাইলে ১০৬টি, বরিশালে ১০৪টি এবং খুলনায় ১০৩টি কলেজ ও স্কুল অ্যান্ড কলেজ। সবচেয়ে কম মাত্র ১৪টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে বান্দরবানে। এরপর মেহেরপুরে ১৯টি, খাগড়াছড়িতে ২০টি, রাঙামাটিতে ২২টি এবং নড়াইলে ২৪টি। চুয়াডাঙ্গায় রয়েছে ২৫টি, মুন্সিগঞ্জে ২৯টি, মাদারীপুরে ৩০টি, শেরপুরে ৩২টি এবং মানিকগঞ্জ ও শরীয়তপুরে ৩৩টি করে প্রতিষ্ঠান। সর্বোচ্চ ঢাকা ও সর্বনিম্ন বান্দরবানের মধ্যে ব্যবধান ৩৯৮টি। অর্থাৎ ঢাকায় বান্দরবানের তুলনায় প্রায় ২৯ গুণ কলেজ ও স্কুল অ্যান্ড কলেজ রয়েছে। জেলার পাশাপাশি উপজেলা ও থানা পর্যায়েও কোনো কোনো এলাকায় বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
ব্যানবেইসের একই তথ্যে দেশের ৫৫৮টি উপজেলা ও থানা ধরে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৬৮টি কলেজ ও স্কুল অ্যান্ড কলেজ রয়েছে গাজীপুর সদরে। এরপর সিলেট সদরে ৫১টি, রংপুর সদরে ৪৯টি, ময়মনসিংহ সদরে ৪১টি এবং ঢাকার সাভারে ৩৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর পরেই নরসিংদী সদরে ৩৪টি, বগুড়া সদরে ২৮টি, যশোর কোতয়ালিতে ২৮টি এবং দিনাজপুর ও জামালপুর সদরে ২৭টি করে প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কোথায় কত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, সেই পরিকল্পনা না থাকায় এমন পরিস্থিতি হয়েছে বলে মনে করছেন ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, মূল সমস্যা হচ্ছে, আমরা কোনো ম্যাপিং করিনি। ক্যাচমেন্ট এরিয়া বা জাতীয় প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে কোথায় কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, তার কোনো পরিকল্পনা করা হয়নি। এ কারণেই একদিকে বলা হয়, এত শিক্ষার্থী পাস করেছে, তাদের ভর্তি করার আসন নেই, তাদের কী হবে? আবার অন্যদিকে বলা হচ্ছে, কলেজে বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকবে। এর কোনোটিই হওয়ার কথা নয়। প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধির বিপরীতে শিক্ষার্থী সংকটের চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়েছে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রমে। এবার একাদশে ভর্তিযোগ্য কলেজ ও মাদরাসার সংখ্যা ৮ হাজার ১৮০টি। এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ। অথচ এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৪৪ হাজারের কিছু বেশি শিক্ষার্থী। পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সবাই একাদশে ভর্তির জন্য আবেদন করেনি। প্রথম ধাপে আবেদন করে ৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৩০ জন। তাদের মধ্যে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে ৯ লাখ ৮০ হাজার ৮১৫ জন। অর্থাৎ এসএসসি ও সমমানে উত্তীর্ণদের মধ্যে পৌনে দুই লাখের বেশি শিক্ষার্থী প্রথম ধাপে একাদশে ভর্তির আবেদনই করেনি। শিক্ষার্থী সংকটের সবচেয়ে বড় চিত্র দেখা গেছে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বরাদ্দে। দেশের ১১টি কলেজে ভর্তির জন্য একজন শিক্ষার্থীও আবেদন করেনি। এর মধ্যে নয়টিই বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের অধীন। যদিও এর অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠান আগেই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদান বাতিলের আবেদন করেছিল বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে।
এদিকে আবেদন পেয়েও একজন শিক্ষার্থীও বরাদ্দ পায়নি আরও ৪১৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যেমন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস মডেল কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ৪৫০টি আসন থাকলেও একজন শিক্ষার্থীও ভর্তির জন্য বরাদ্দ পায়নি। এর বাইরে প্রায় ৮০০ কলেজ-মাদরাসায় শিক্ষার্থী পাওয়া গেছে মাত্র ১ থেকে ১০ জন। এই বিপুল আসন ও শিক্ষার্থী সংকটকে পরিকল্পনার ঘাটতিরই ফল হিসেবে দেখছেন অধ্যাপক মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, এ কারণেই একদিকে বলা হয়, এত শিক্ষার্থী পাস করেছে, তাদের ভর্তি করার আসন নেই, তাদের কী হবে? আবার অন্যদিকে বলা হচ্ছে, কলেজে বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকবে। এর কোনোটিই হওয়ার কথা নয়। শত শত কলেজ যখন শিক্ষার্থীর জন্য হাহাকার করছে, তখন পরিচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দেখা গেছে বিপরীত চিত্র। সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে। প্রতিষ্ঠানটির ৯৮১টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেছে ৩২ হাজার ৬৭৮ জন। অর্থাৎ প্রতিটি আসনের বিপরীতে আবেদন পড়েছে ৩৩টির বেশি। ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ২ হাজার ৩৭৯টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেছেন ৩২ হাজার ৬৪০ জন। ঢাকা সিটি কলেজের ৪ হাজার ২৮০টি আসনের জন্য আবেদন করেছেন ৩১ হাজার ৯৫১ জন। আবেদনের সংখ্যায় শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে সরকারি বাঙলা কলেজ, বিএএফ শাহীন কলেজ, রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ ও সরকারি তোলারাম কলেজ। আসনের সামগ্রিক উদ্বৃত্ত থাকার পরও পছন্দের প্রতিষ্ঠান না পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। প্রথম ধাপে আবেদন করেও কোনো প্রতিষ্ঠানে আসন পায়নি ১৪ হাজার ৪১৫ জন। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী ২ হাজার ২০৫ জন। অর্থাৎ সংকটটি সামগ্রিক আসনের নয়; শিক্ষার্থীদের পছন্দের প্রতিষ্ঠান ও সেখানে থাকা আসনের মধ্যে বড় ব্যবধানও রয়েছে। অধ্যাপক মজিবুর রহমানের মতে, শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি না করে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার মান নিশ্চিত করার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, এই তামাশা বন্ধ করে আমাদের মূল মনোযোগ দেওয়া উচিত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায়। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এই পর্যায়ের শিক্ষা যথাযথভাবে দিতে পারলে সমাজে বসবাসের উপযোগী ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা সম্ভব হবে।





