আজ সঙ্গীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদ এর জন্মদিন
নিজস্ব সুর, ব্যতিক্রমী সংগীতায়োজন আর লোকগানের সঙ্গে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের মেলবন্ধন—এই বৈশিষ্ট্যগুলোই হাবিব ওয়াহিদকে বাংলা গানের জগতে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে তাঁর গান ছুঁয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজন্মের শ্রোতাদের। ‘কৃষ্ণ’, ‘ময়না গো’ কিংবা ‘দিন গেল’—এমন অনেক গান আজও শ্রোতাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। আজ ১৫ অক্টোবর, এই সংগীতশিল্পীর জন্মদিন। ১৯৭৯ সালের এই দিনে ঢাকায় জন্ম নেওয়া হাবিব ওয়াহিদ ৪৭ বছরে পা দিলেন।
বাংলা গানের জগতে কিছু শিল্পী আছেন, যাঁরা শুধু গান গেয়েই জনপ্রিয় হন না, বরং সংগীতের প্রচলিত ধারায়ও নতুন মাত্রা যোগ করেন। হাবিব ওয়াহিদ তেমনই একজন। গায়ক হিসেবে পরিচিতি পেলেও তাঁর সংগীতজীবনের বড় অংশজুড়ে রয়েছে সুর সৃষ্টি, সংগীত পরিচালনা ও সংগীত প্রযোজনার কাজ। বাংলা লোকগানের চিরচেনা সুরকে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নতুনভাবে উপস্থাপন করাই তাঁকে শ্রোতাদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত করেছে।
আরও পড়ুন: মেয়ের প্রথম জন্মদিনে অপূর্বর আবেগঘন পোস্ট, প্রকাশ করলেন ছবি
সংগীতশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদের ছেলে হাবিব ছোটবেলা থেকেই সংগীতের পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। তবে পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরির জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন ভিন্ন পথ। সংগীতের প্রতি আগ্রহ থেকেই ১৯৯৯ সালে যুক্তরাজ্যে গিয়ে শব্দ প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করেন। সংগীত তৈরির প্রযুক্তিগত দিক সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সুর ও শব্দের বিন্যাস নিয়েও তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে।
২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সংগীতায়োজনে ‘কৃষ্ণ’ অ্যালবাম। বাংলা লোকগানের সঙ্গে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের মেলবন্ধন অ্যালবামটিকে আলাদা পরিচিতি দেয়। বিশেষ করে বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের গান নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতে এই অ্যালবাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিচিত লোকসুরকে নতুন সংগীতায়োজনে উপস্থাপন করে হাবিব দেখিয়েছিলেন, ঐতিহ্য ধরে রেখেও সংগীতে নতুনত্ব আনা সম্ভব।
আরও পড়ুন: ৩৯ বছর পর ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’র পোশাকে অনিল কাপুর
এরপর ‘মায়া’, ‘ময়না গো’ ও ‘শোনো’র মতো অ্যালবাম দিয়ে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেন তিনি। ‘ময়না গো’ অ্যালবামের ‘দিন গেল’ গানটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা পায়। লোকগানের আবেদন, আধুনিক সুর এবং সহজে মনে রাখার মতো সংগীতায়োজন—সব মিলিয়ে হাবিবের গান হয়ে ওঠে তরুণ শ্রোতাদের কাছে নতুন এক অভিজ্ঞতা।
হাবিব ওয়াহিদের সংগীতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি লোকগানের মূল আবেগ অক্ষুণ্ন রেখে তাতে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহার করেছেন। ফলে তাঁর গান একদিকে শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, অন্যদিকে তৈরি করে সমকালীন সংগীতের স্বাদ। এই মেলবন্ধন তাঁকে শুধু জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী হিসেবেই নয়, সংগীত প্রযোজক হিসেবেও আলাদা অবস্থান এনে দিয়েছে।
একসময় গানের অ্যালবামের মাধ্যমে যে সংগীতযাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়েছে ডিজিটাল মাধ্যমেও। সংগীতশিল্পী হিসেবে হাবিব এই পরিবর্তনের সঙ্গেও নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। চলচ্চিত্রের গানেও পেয়েছেন আলাদা পরিচিতি। ‘হৃদয়ের কথা’ চলচ্চিত্রের ‘ভালোবাসব বাসব রে বন্ধু’ গানটি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রের জন্য সংগীত পরিচালনা ও গান তৈরির কাজেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি।
সময় বদলেছে, বদলেছে গান শোনার মাধ্যম ও শ্রোতাদের রুচি। তবু হাবিব ওয়াহিদের কিছু গান আজও শ্রোতাদের কাছে সমান পরিচিত। ‘কৃষ্ণ’, ‘দিন গেল’, ‘ভালোবাসব বাসব রে বন্ধু’, ‘বেনি খুলে’ কিংবা ‘মায়া লাগাইছে’—গানগুলো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর সংগীতের আবেদন যে একটি নির্দিষ্ট সময় বা প্রজন্মের মধ্যে আটকে নেই, বিভিন্ন বয়সী শ্রোতার আগ্রহও তার প্রমাণ।
সাম্প্রতিক সময়েও লোকগান ও আধুনিক সংগীতের মেলবন্ধনে নতুন কাজ নিয়ে আলোচনায় এসেছেন হাবিব। ‘কোক স্টুডিও বাংলা’র মঞ্চে তাজিক সংগীতশিল্পী মেহরনিগোরি রুস্তমের সঙ্গে ‘মহাজাদু’ গানে তাঁর অংশগ্রহণ শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরপর লোকশিল্পী কায়ার সঙ্গে দুই দশকেরও বেশি সময় পর আবার কাজ করেন তিনি। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন সংগীতশিল্পী ও প্রযোজক মুজা। ‘কই রইলা রে’ গানটির মধ্য দিয়ে পুরোনো সংগীত-সহযোগিতাও ফিরে আসে নতুন আবহে।
সংগীতজগতে দীর্ঘ পথচলায় হাবিব ওয়াহিদ প্রমাণ করেছেন, জনপ্রিয়তার পাশাপাশি নিজের কাজের ধরনেও স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখা সম্ভব। তিনি কখনো লোকগানের দিকে ফিরেছেন, কখনো আধুনিক প্রেমের গান তৈরি করেছেন, আবার কখনো চলচ্চিত্রের গল্প ও আবহের সঙ্গে মিলিয়ে সাজিয়েছেন সুর। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন কিছু করার চেষ্টা তাঁর সংগীতযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জন্মদিনে হাবিব ওয়াহিদকে ফিরে দেখার অর্থ তাই কেবল তাঁর জনপ্রিয় গানগুলোর তালিকা মনে করা নয়; বরং বাংলা গানের পরিচিত সুরকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি দীর্ঘ যাত্রাকে স্মরণ করা। লোকসংগীতের শেকড় আর আধুনিক সংগীতের ভাষাকে এক সুতোয় গেঁথে তিনি যে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন, সেটিই তাঁর সংগীতজীবনের অন্যতম বড় পরিচয়। নতুন সুরের খোঁজে তাঁর এই পথচলা আগামী দিনেও শ্রোতাদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকবে—এমন প্রত্যাশা সংগীতপ্রেমীদের।





