ভাইরাল হওয়ার জন্য কখনো মানহীন কাজ করব না: তাসনুভা তিশা

Shahrier Islam Pallab
শাহরিয়ার ইসলাম পল্লব
প্রকাশিত: ৯:৫৯ অপরাহ্ন, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৯:৫৯ অপরাহ্ন, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ বাংলাবাজার পত্রিকা গ্রাফিক্স
ছবিঃ বাংলাবাজার পত্রিকা গ্রাফিক্স

ছোট পর্দার পরিচিত মুখ অভিনেত্রী তাসনুভা তিশা। অভিনয়জীবনের শুরুটা পরিকল্পিত না হলেও নিজের অভিনয়দক্ষতা দিয়ে ধীরে ধীরে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। শিহাব শাহীন পরিচালিত ওয়েব সিরিজ ‘আগস্ট ১৪’-তে তুশি চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে আলোচনায় আসেন এই অভিনেত্রী। এরপর থেকে চরিত্রের বৈচিত্র্য ও গল্প নির্বাচনে সচেতনতার মাধ্যমে নিজের অভিনয়ের আলাদা পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি। খুঁটিনাটি তুলে ধরেছেন শাহরিয়ার ইসলাম পল্লব।

অভিনয়ের পাশাপাশি কাজের মান, গল্পের গুরুত্ব, ওটিটি ও চলচ্চিত্রে সম্ভাবনা নিয়ে বরাবরই নিজের অবস্থান স্পষ্ট রেখেছেন তাসনুভা তিশা। জনপ্রিয়তা কিংবা ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় নিজেকে ভাসিয়ে দিতে চান না তিনি। বরং ভালো গল্প, মানসম্মত চিত্রনাট্য ও দক্ষ নির্মাতার সঙ্গে কাজ করাকেই বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁর ভাষায়, ভাইরাল হওয়ার জন্য কখনো মানহীন কাজ করবেন না, কেউ তাঁকে দিয়েও তা করাতে পারবে না।

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের শিল্পী ইমনকে চরম হেনস্তা

সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে তাসনুভা তিশা অভিনীত নাটক ‘মায়ার শহর’। শহুরে জীবনের সম্পর্ক, ভালোবাসা ও নানা টানাপোড়েনের গল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার কাছে ছিল দারুণ। নাটকটির মায়া চরিত্রের সঙ্গে নিজের জীবনের কিছু মিলও খুঁজে পেয়েছেন তিনি। তিশার মতে, জীবনের নানা কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও মায়া আশাবাদী থাকতে জানে। ব্যক্তিগত জীবনেও প্রতিকূলতার মধ্যে ইতিবাচক দিক খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

বর্তমান সময়ে টেলিভিশন নাটকের জনপ্রিয়তা পরিমাপের ক্ষেত্রে ইউটিউবের ভিউ, ট্রেন্ডিং ও দর্শকসংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এসব সূচককে অভিনয় কিংবা গল্পের মানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে নারাজ তাসনুভা তিশা। তার কাছে একটি নাটকের মূল শক্তি গল্প ও সংলাপ। দর্শকসংখ্যা বাড়াকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও শুধু ভাইরাল হওয়ার জন্য কোনো কাজ করতে চান না তিনি।

আরও পড়ুন: বাক্‌স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার গান নিয়ে অ্যাবাউট ডার্কের ‘নিরাকার’

তিনি বলেন, দর্শকের নাটক দেখার অভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। ছোট ছোট ভিডিও দেখার প্রবণতার মধ্যেও অনেকে এখন নাটক খুঁজে দেখছেন। তাই দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে। তবে সে ক্ষেত্রে নির্মাতাদের মানসম্মত কাজের প্রতি আরও মনোযোগী হতে হবে। নিম্নমানের নাটক নির্মাণের পরিবর্তে ভালো গল্প ও সংলাপের দিকে নজর দিলে মানসম্মত নাটকের সংখ্যাও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। 

অভিনয়ের মাধ্যম নিয়েও নির্দিষ্ট কোনো সীমারেখা টানতে চান না এই অভিনেত্রী। টেলিভিশন, ইউটিউব কিংবা ওটিটি-সব মাধ্যমেই সমান আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করেন তিনি। তবে ওটিটিতে তুলনামূলক বেশি বাজেট থাকায় মহড়া, চরিত্রের সাজসজ্জা যাচাই এবং দৃশ্যধারণের আগে প্রস্তুতির সুযোগ পাওয়া যায়। অন্যদিকে, নাটকে কম বাজেট ও স্বল্প সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হয়। 

তারপরও তিশার কাছে মাধ্যমের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভালো গল্প, চিত্রনাট্য, দক্ষ নির্মাতা, সহশিল্পী এবং পেশাদার কর্মপরিবেশ। একটি কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেককে দায়িত্বশীল হতে হবে। পাশাপাশি আর্থিক বিষয়েও স্বচ্ছতা থাকা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

টেলিভিশন ও ওটিটিতে কাজ করলেও বড় পর্দায় অভিনয়ের আগ্রহ রয়েছে তাসনুভা তিশার। বিশেষ করে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে কাজ করতে চান তিনি। নিজেকে খুব গ্ল্যামারাস মনে না করলেও চরিত্রের প্রয়োজনে সেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারবেন বলে বিশ্বাস তাঁর।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং নতুন ধরনের সিনেমা নির্মাণের বিষয়টিও ইতিবাচকভাবে দেখছেন এই অভিনেত্রী। প্রতিষ্ঠিত নায়কদের সঙ্গে ভালো কোনো বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে কাজের সুযোগ পেলে আগ্রহী হবেন তিনি। তবে শুধু সিনেমায় অভিনয়ের জন্য সিনেমা করতে চান না। তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে চলচ্চিত্রে কাজ করবেন, সেটি যেন ভালোভাবে করতে পারেন। 

নারী চরিত্রের উপস্থাপন নিয়েও রয়েছে তাঁর নিজস্ব পর্যবেক্ষণ। প্রেমের গল্পের বাইরে বিভিন্ন ধরনের নাটকে কাজ করেছেন তিনি। এর মধ্যে কিছু গল্প সুন্দর ও পরিবার নিয়ে দেখার মতো হলেও সেগুলো প্রত্যাশিত জনপ্রিয়তা পায়নি। তাঁর মতে, দর্শক এখন দৈনন্দিন জীবনের চাপ থেকে মুক্তি পেতে হাস্যরসাত্মক ও রোমান্টিক-কমেডি ধরনের নাটক বেশি পছন্দ করেন।

তবে নারী চরিত্রকে শুধু প্রেমের গল্পে আটকে রাখা হয়েছে বলে মনে করেন না তিনি। বরং বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের অধিকাংশ চলচ্চিত্র ও নাট্যশিল্প এখনো নায়ককেন্দ্রিক। প্রতিষ্ঠিত নায়কেরা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেই এই অবস্থানে এসেছেন বলে মনে করেন তিশা। বিষয়টিকে বাস্তবতা হিসেবেই দেখেন তিনি।

ভালো নির্মাতাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও নিজে থেকে ফোন করে কাজ চাওয়ার অভ্যাস নেই তাসনুভা তিশার। নির্মাতাদের সঙ্গে দেখা হলে মজা করে বলেন, ‘ভাই কাজ করবেন না নাকি, ভুলে গেছেন?’ তবে ফোন করে কোনো চরিত্র বা কাজ চাওয়াটা তাঁর স্বভাবে নেই। তাঁর বিশ্বাস, কোনো গল্পে তাঁকে প্রয়োজন হলে নির্মাতারাই যোগাযোগ করবেন।

এত দিন এই অভ্যাসের কারণে ক্যারিয়ারে বড় কোনো প্রভাব পড়েনি বলে জানালেও নিজের স্পষ্টবাদী স্বভাব নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে তার। যা মনে করেন, তা সরাসরি বলতেই পছন্দ করেন। তবে এই স্বভাব কাজের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন তিনি। গত বছর কিংবা তার আগের বছরের তুলনায় বর্তমানে কাজের গতিও কমেছে বলে জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী।

অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনার প্রতিও আগ্রহ রয়েছে তাসনুভা তিশার। নাটক কিংবা অন্য যেকোনো ধরনের কাজ পরিচালনা করতে চান তিনি। তবে অভিনয় চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিচালনায় যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা নেই তার। অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার পরই পরিচালকের চেয়ারে বসতে চান এই অভিনেত্রী।

একজন নারী অভিনেত্রীকে অভিনয়ের বাইরেও চেহারা, বয়স, পোশাক, সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়। তাসনুভা তিশার মতে, শিল্পীদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে দর্শকের আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। তবে সেই আগ্রহের সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত জীবনের নেতিবাচক বিষয়গুলো অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

বিশেষ করে বিয়ে, বিচ্ছেদ, সন্তান কিংবা শারীরিক গঠন নিয়ে কটাক্ষ করার প্রবণতাকে নেতিবাচক বলে মনে করেন তিনি। পেশাগত অনিয়মের খবর প্রকাশ করা এবং কারও ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময়কে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা এক বিষয় নয়। তাঁর মতে, শিল্পী ও বিনোদন সাংবাদিকেরা একই দলের অংশ। তাই শিল্পীদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে নেতিবাচক ও অসম্মানজনক প্রচারণা বন্ধে সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

অভিনয়ের ব্যস্ততার পাশাপাশি সন্তানদের সময় দেওয়া ও সংসার সামলানোও তাসনুভা তিশার জীবনের বড় চ্যালেঞ্জ। একজন কর্মজীবী মা হিসেবে সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারার অপরাধবোধ কাজ করে তর মধ্যে। শুটিংয়ের কারণে কখনো সন্তানদের জন্মদিন, অসুস্থতার সময় কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে পাশে থাকা সম্ভব হয় না।

তবে অভিনয় তার পেশা। আগে থেকেই শুটিংয়ের তারিখ নির্ধারিত থাকায় প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হয়। ফলে কাজ ও সংসারের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। তার মতে, অনেক কর্মজীবী মা এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেদের জীবনের মিল খুঁজে পাবেন।

তাসনুভা তিশার অভিনয়জীবনের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি ‘আগস্ট ১৪’। শিহাব শাহীন পরিচালিত এই ওয়েব সিরিজে তুশি চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের প্রশংসা পেয়েছেন তিনি। কাজটিতে সাহসী দৃশ্যেও অভিনয় করতে দেখা গেছে তাকে। তবে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই তাঁর। 

তিশার ভাষায়, ‘আগস্ট ১৪’ তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ। এখনো এই কাজের জন্য দর্শকদের কাছ থেকে প্রশংসা পান তিনি। অনেকে তাকে কাজটি না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তেই অভিনয় করেছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি আনন্দিত।

জনপ্রিয়তার চেয়ে কাজের মান, ভাইরাল হওয়ার চেয়ে গল্পের গুরুত্ব এবং প্রচারের চেয়ে অভিনয়ের প্রতি দায়বদ্ধতাকেই প্রাধান্য দিতে চান তাসনুভা তিশা। সামনে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও ভালো গল্প ও উপযুক্ত চরিত্রের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। নিজের শর্ত ও বিশ্বাস অটুট রেখে অভিনয়ের পথেই এগিয়ে যেতে চান এই অভিনেত্রী।