ডেঙ্গুতে বড় হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল
- ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়ে আরও ৮ জনসহ মৃত্যু ছাড়ল দেড়শ
- নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৭৩৩ জন
- ডেঙ্গুতে আক্রান্ত পরিবারগুলো চিকিৎসা নিতে হিমসীম খাচ্ছে
- বিগত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা কম: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী
ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার রাজধানী কিংবা নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশের ৬৪ জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে মশাবাহিত এই রোগের বিস্তার। প্রতিদিনই হু হু করে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। উদ্বেগের বড় কারণ, ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো এবং আক্রান্তদের একটি বড় অংশই তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। বিশেষ করে ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার পরিস্থিতিকে আরও ভাবিয়ে তুলছে। এককথায় বলতে গেলে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি চরম আকার ধারণ করেছে। তবে ডেঙ্গু রোগীর চাপে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও আক্রান্ত পরিবারগুলো চিকিৎসা দিতে ও নিতে চরম হিমশিম খাচ্ছে। পরীক্ষা, ওষুধ ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে মৃত্যুর মিছিলে আক্রান্ত হয়ে যুক্ত হয়েছে আরও আটজনসহ মোট দেড়শ। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৭৩৩ জন রোগী। এতে চলতি বছর মশাবাহিত রোগটিতে এ পর্যন্ত মোট প্রাণহানি ১৫৭ জনে দাঁড়াল। এ ছাড়া গত একদিনে ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ৭৩৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু-বিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
আরও পড়ুন: হামের উপসর্গে আরও ৮ জনের মৃত্যু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত একদিনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম বিভাগে ডেঙ্গুতে ৩ জন করে মোট ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন করে আরও ২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি (৩৮৮ জন) ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়াও উল্লেখিত সময়ে খুলনা বিভাগে ৩০২ জন ছাড়াও চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯১, বরিশাল বিভাগে ১৯১, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭০, রাজশাহী বিভাগে ১৪৫, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৪৩, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১০, রংপুর বিভাগে ৮৬ ও সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু নিয়ে ৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশে ডেঙ্গুতে ৩৬ জন মারা গেছেন। এর পরের মাস আগস্টে ৪৩ জন এবং চলতি সেপ্টেম্বরের ১৪ দিনেই ডেঙ্গুতে ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবমিলিয়ে চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনসহ শুধু ঢাকা বিভাগেই ডেঙ্গুতে ৭৯ জন মারা গেছেন।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু
এ ছাড়া উল্লেখিত সময়ে খুলনা বিভাগে ২৭ জন ছাড়াও ময়মনসিংহ বিভাগে ১৬, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৫, বরিশাল বিভাগে ১২, রাজশাহী বিভাগে ৬ জন এবং রংপুর ও সিলেট বিভাগে ডেঙ্গুতে একজন করে মোট ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুতে তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেশি হওয়া জাতীয় জীবনের জন্য উদ্বেগের বিষয়। যাদের চলাচল বা মোবিলিটি বেশি, তাদের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি। কারণ, একজন কর্মক্ষম মানুষ কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিন বাসা থেকে অফিসসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করেন। ফলে বিভিন্ন স্থানে মশার সংস্পর্শে আসার সুযোগও তৈরি হয়। তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার অর্থ শুধু চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এর প্রভাব পড়ে কর্মঘণ্টা ও কর্মস্পৃহাতেও। ফলে ডেঙ্গুর কারণে ব্যক্তি ও পরিবারের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তাদের মতে, তরুণদের বয়স কম হওয়ার কারণে অনেকেই জ্বরকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। বয়স কম হওয়ায় শুরুতে শরীরও এতটা দুর্বল হয় না। দেরি করে হাসপাতালে আসায় ততক্ষণে তারা শকে চলে যায়। এ কারণে তরুণদের মৃত্যু হার বেশি। বিগত বছরের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। তবে সামনের দিনগুলোতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা যাতে আর না বাড়ে, সে জন্য কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি। সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় আয়োজিত ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী।
ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যু আগেও ছিল, এখনও আছে। তবে বিগত বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা যাতে আর না বাড়ে, সে জন্য এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কাজ করছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আরও সক্রিয় ও সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেও দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে তৎপর রয়েছেন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বর্তমান সরকার জনগণের কল্যাণে কাজ করছে উল্লেখ করে ড. আবদুল মঈন খান বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও মানুষের কল্যাণে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। কথা হয় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ এর সঙ্গে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুর সংক্রমণ কেবল রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় সব বিভাগেই ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। বর্ষার কারণে লার্ভাযুক্ত পানির পাত্রের সংখ্যা বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। বাড়ির ভেতর-বাইরে ছোট ছোট পাত্র, ফুলের টব, প্লাস্টিকের বোতল, নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি কিংবা ড্রামের মতো উৎসে লার্ভার বিস্তার ঘটছে।
তিনি আরো বলেন, লার্ভার উৎস ধ্বংস ছাড়া এ রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এ সমস্যা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, পরিবেশ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও জনগণ, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। একইসুরে কথা বলেছেন রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, গতানুগতিক ধারায় ডেঙ্গু চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তিনি বলেন, শুধু জটিল ও সংকটাপন্ন রোগীদের সময়মতো বড় হাসপাতালে স্থানান্তর করা উচিত।





