সারাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তারের শঙ্কা

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:১৫ অপরাহ্ন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৮:১৪ অপরাহ্ন, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা
  • ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের বেশি মৃত্যু হচ্ছে
  • ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবসে মাঠে নেমেছে ডিএনসিসির দেড় হাজার সদস্য

ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার এখন আর রাজধানী কিংবা নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশের ৬৪ জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে মশাবাহিত এই রোগের বিস্তার। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। উদ্বেগের বড় কারণ, ডেঙ্গুতে প্রাণ হারানো এবং আক্রান্তদের একটি বড় অংশই তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। বিশেষ করে ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার পরিস্থিতিকে আরও ভাবিয়ে তুলছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলাতেই বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। ১০ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৭৯০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪১ জনে। আর আক্রান্তের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ২২০ জনে।

আরও পড়ুন: হামের উপসর্গে আরও ৭ মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১ হাজার ৯

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী এবং ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ। তবে মৃত্যুর ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫২ দশমিক ১ শতাংশ নারী এবং ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ পুরুষ। ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী রয়েছে খুলনা বিভাগে। এ বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ৭ হাজার ৮৯৭ জন। আর সিটি করপোরেশনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৪৬ জন। ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ১৪১ জনের মধ্যে ৬৭ জনের বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ, মোট মৃত্যুর বড় একটি অংশই তরুণদের। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ২১ জন। আক্রান্তের হিসাবেও তরুণরাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী। চলতি বছর ডেঙ্গুতে ১৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ হাজার ৮৩ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী। এই সংখ্যা ৭ হাজার ১২৯ জন। চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে আগস্ট মাসে-২০ হাজার ৫৩৬ জন। তবে সেপ্টেম্বরেই সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে। চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ হাজার ৩৭৪ জন। অন্যদিকে, এ বছর সবচেয়ে কম ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে মার্চ মাসে ৩৫৩ জন। মৃত্যুর হিসাবেও সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনেই ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৪৪ জন, যা এ বছরের কোনো একক মাসের তুলনায় এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। আগস্টে মৃত্যু হয়েছে ৪৩ জনের। আর সবচেয়ে কম মৃত্যু হয়েছে মে মাসে, মাত্র একজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুতে তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেশি হওয়া জাতীয় জীবনের জন্য উদ্বেগের বিষয়। যাদের চলাচল বা মোবিলিটি বেশি, তাদের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি। কারণ, একজন কর্মক্ষম মানুষ কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিন বাসা থেকে অফিসসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করেন। ফলে বিভিন্ন স্থানে মশার সংস্পর্শে আসার সুযোগও তৈরি হয়। তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার অর্থ শুধু চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এর প্রভাব পড়ে কর্মঘণ্টা ও কর্মস্পৃহাতেও। ফলে ডেঙ্গুর কারণে ব্যক্তি ও পরিবারের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের একগুচ্ছ কর্মসূচি

তাদের মতে, তরুণদের বয়স কম হওয়ার কারণে অনেকেই জ্বরকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। বয়স কম হওয়ায় শুরুতে শরীরও এতটা দুর্বল হয় না। দেরি করে হাসপাতালে আসায় ততক্ষণে তারা শকে চলে যায়। এ কারণে তরুণদের মৃত্যু হার বেশি। রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, গতানুগতিক ধারায় ডেঙ্গু চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে জ্বর হলেই দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা নিশ্চিত করার সুযোগ থাকতে হবে, যাতে মানুষ শুরুতেই সতর্ক হতে পারে। সাধারণ ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশাল বা বিশেষায়িত হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি লেভেলের হাসপাতালেই পর্যাপ্ত চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা জরুরি। শুধু জটিল ও সংকটাপন্ন রোগীদের সময়মতো বড় হাসপাতালে স্থানান্তর করা উচিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুর ডেন-২ সেরোটাইপের আধিপত্য ছিল। এবার ডেন-৩ সেরোটাইপ বেশি সক্রিয় হওয়ায় আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। কারণ, একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য সেরোটাইপে পুনরায় সংক্রমিত হলে রোগের জটিলতা এবং মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ডেঙ্গুর সংক্রমণ কেবল রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় সব বিভাগেই ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। বর্ষার কারণে লার্ভাযুক্ত পানির পাত্রের সংখ্যা বিপজ্জনকভাবে বেড়েছে। বাড়ির ভেতর-বাইরে ছোট ছোট পাত্র, ফুলের টব, প্লাস্টিকের বোতল, নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি কিংবা ড্রামের মতো উৎসে লার্ভার বিস্তার ঘটছে। তিনি বলেন, এখনই জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। মশক নিধন কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিতভাবে চালাতে হবে। লার্ভার উৎস ধ্বংস ছাড়া এ রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। আর ডেঙ্গুকে শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা যাবে না। এ সমস্যা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, পরিবেশ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও জনগণ, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

এদিকে, জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১ হাজার ৫০০ সদস্যের সমন্বয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শনিবার থেকে ২৪টি দলে ভাগ হয়ে ডিএনসিসির ১০টি অঞ্চলের ৫৪টি ওয়ার্ডে বাড়ি বাড়ি পরিদর্শন, এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমের উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের স্থাপিত ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবসের স্টল পরিদর্শন করেন। এ সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. ইমরুল কায়েস প্রধানমন্ত্রীকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ডিএনসিসির বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং ব্যবহৃত কার্যকর উপকরণ সম্পর্কে অবহিত করেন। ডিএনসিসি জানিয়েছে, জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে বিশেষ মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। এর আওতায় ডিএনসিসির অঞ্চল-৫, বিশেষ করে সংসদ ভবন ও এর আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ সোর্স রিডাকশন, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং লার্ভা নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে ডিএনসিসির ১০টি অঞ্চলের ৫৪টি ওয়ার্ডে জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিবসের কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে বিশেষ মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ কার্যক্রমে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল এবং আগে শনাক্ত ডেঙ্গু হটস্পটগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ডিএনসিসি বলছে, এই কার্যক্রমে শুধু মশক নিধনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করা, উৎস ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী লার্ভিসাইড প্রয়োগের মাধ্যমে সোর্স রিডাকশনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।