ভেসে যাওয়া মরদেহ শনাক্তে বিপাকে নেপাল, মর্গে জায়গা সংকট

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ৯:১৯ পূর্বাহ্ন, ২৯ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১০:২৯ পূর্বাহ্ন, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

নেপালে ভয়াবহ বন্যার পর নদীর স্রোতে ভেসে আসা মরদেহ শনাক্ত করতে বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মরদেহ সংরক্ষণ করতে গিয়ে হাসপাতালের মর্গগুলোতেও দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট।

চিতওয়ানের ভারতপুরে বিদ্যুৎ অফিস সড়কের কাছে অস্থায়ী মরদেহ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের সামনে ভিড় করেন নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারের সদস্যরা। কেউ হাতে পুরোনো ছবি, আবার কেউ মোবাইল ফোনে নিখোঁজ স্বজনের ছবি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন।

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র শর্ত পূরণ করলে, ইরানও হরমুজ খুলে দেবে: মাসুদ পেজেশকিয়ান

তাদের একজন দামোদর অধিকারী। ছেলের খোঁজে তিনি দাং জেলার তুলসীপুর থেকে রাতভর ভ্রমণ করে ভারতপুরে আসেন। তার ছেলে নারায়ণ অধিকারী ত্রিশূলী নদীর পাশের একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করতেন। বুধবারের ভয়াবহ বন্যায় নদীর পানি বেড়ে যাওয়ার পর পাঁচ সহকর্মীর সঙ্গে তিনি নিখোঁজ হন। চিতওয়ানেই ২৩৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এসবের মধ্যে মাত্র ৮২টি মরদেহের ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।

দামোদর বলেন, নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি দ্রুত প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে পরিবারগুলো তাদের স্বজনকে শনাক্ত করতে পারে।

আরও পড়ুন: বন্যায় নিখোঁজদের উদ্ধারে বিদেশি সহায়তা নেবে নেপাল

নেপালের বিভিন্ন নদীতে বন্যার পানির সঙ্গে মরদেহ অনেক দূর পর্যন্ত ভেসে গেছে। ত্রিশূলী, মার্শ্যাংদি ও নারায়ণী নদীর তীরবর্তী রাশুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং, তানাহুন, গোরখা, চিতওয়ান, নাওয়ালপরাসি ইস্ট ও নাওয়ালপরাসি ওয়েস্ট এলাকায় মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

বিপুলসংখ্যক মরদেহ আসায় হাসপাতালের মর্গগুলোতে জায়গা সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক জায়গায় কমিউনিটি হল, পুলিশ কম্পাউন্ডসহ বিভিন্ন স্থাপনাকে অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এসব স্থানের অনেকগুলোতেই পর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বা মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। ফলে গরমের মধ্যে দ্রুত মরদেহ পচে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উদ্ধার করা কিছু মরদেহ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে মুখ দেখে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও বিচ্ছিন্ন অঙ্গ ও আংশিক মরদেহও পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে শনাক্তকরণের জন্য ট্যাটু, গয়না, পোশাক, আঙুলের ছাপ এবং ডিএনএ পরীক্ষার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।

এদিকে বন্যায় সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের জেলা শহরে পৌঁছানো এবং প্রয়োজনীয় নমুনা সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

চিতওয়ানের প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল জানান, শুরুতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে শুকনো বরফ ব্যবহার করে মরদেহ সংরক্ষণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত শুকনো বরফ পাওয়া না যাওয়ায় পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে।

ভারতপুরের মরদেহ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা সুবাস সুনার বলেন, মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্রের আশপাশে দুর্গন্ধ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চিতওয়ানে ২৩৩টি, নাওয়ালপরাসি ইস্টে ১৫৪টি, গোরখায় ৪৬টি, ধাদিংয়ে ৪০টি, নুয়াকোটে ৩৭টি, তানাহুনে ৩১টি, নাওয়ালপরাসি ওয়েস্টে ২৭টি এবং রাশুয়ায় ১২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ সংকট

নাওয়ালপরাসি ইস্টেও বিপুলসংখ্যক মরদেহ আসায় স্থানীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে। সেখানে প্রাথমিক ময়নাতদন্ত করার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছয়জন চিকিৎসাকর্মী থাকলেও কোনো স্বীকৃত ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নেই। ফলে জরুরি সহায়তার জন্য কাঠমান্ডুর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

জেলার প্রধান কর্মকর্তা জগদীশ্বর উপাধ্যায় বলেন, এত বড় দুর্যোগের জন্য তারা প্রস্তুত ছিলেন না। শনাক্ত হওয়া মরদেহ যত দ্রুত সম্ভব পরিবারের কাছে হস্তান্তর এবং বাকি মরদেহের ময়নাতদন্ত ও নমুনা সংগ্রহ দ্রুত শেষ করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।

নাওয়ালপরাসি ইস্টে উদ্ধার হওয়া ১৫৪টি মরদেহের মধ্যে ৪৮টি গাইডাকোট পৌর হাসপাতাল, ৪৬টি মধ্যবিন্দু প্রাদেশিক হাসপাতাল, আটটি পালপা এবং ৪১টি পোখরায় রাখা হয়েছে। আরও একটি মরদেহ কাভাসোটি এলাকার একটি কমিউনিটি ফরেস্ট হলে রাখা হয়েছে, যেখানে জরুরি ভিত্তিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে ৫২ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, ৩৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী, ১১ জন কিশোরী ও আটজন কিশোর রয়েছে। ৪৯টি মরদেহ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে তাদের লিঙ্গও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এমন মরদেহ দাফনের আগে কর্তৃপক্ষকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

ট্যাটুতে মিলল নিখোঁজ স্বজনের পরিচয়

নিখোঁজ স্বজনদের শনাক্ত করতে ছোট একটি শারীরিক চিহ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। হেটৌডার ২৫ বছর বয়সী খননযন্ত্র চালক সুমন গোলে ত্রিশূলী নদীর একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করতেন। ২৬ আগস্ট রাতে কাজ শেষে নদীর তীরে তার থাকার জায়গায় ফেরার পরপরই প্রবল স্রোতে তিনি ভেসে যান।

পরদিন তার চাচা উমেশ সিয়াংবো বন্ধুদের নিয়ে চিতওয়ান ও নাওয়ালপরাসির বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ শুরু করেন। সুমনের ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশও অজ্ঞাত মরদেহের ছবি প্রকাশ করে।

পরে নাওয়ালপরাসির স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের প্রকাশিত একটি ছবিতে সুমনের বুকে থাকা বিশেষ ধরনের একটি ট্যাটু দেখতে পান। ট্যাটুটিতে তার স্ত্রীর নাম লেখা ছিল। সেই চিহ্নের মাধ্যমে পরিবারটি শেষ পর্যন্ত সুমনের মরদেহ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

উমেশ বলেন, পানির স্রোত ও আঘাতে সুমনের মুখ পুরোপুরি বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। শুধু বুকে স্ত্রীর নামের ট্যাটু থাকার কারণেই তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কয়েক দিন ধরে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ঘুরে স্বজনকে খুঁজতে হয়েছে তাদের।

তিনি বলেন, সুমনকে আর জীবিত পাওয়া যাবে না—এটি অত্যন্ত কষ্টের। তবে অন্তত তার মরদেহ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে নিতে পারায় তারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।