তেল-গ্যাস-কয়লার দাম বাড়ায় চাপে বিদ্যুৎ খাত, লোকসান ৬০ হাজার কোটি ছাড়ানোর আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জ্বালানি সংকটের নতুন শঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাতের বিস্তারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পালটাপালটি হামলার প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহণ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তেল, এলএনজি ও কয়লার বাড়তি দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের লোকসান ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।
চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা লোকসানের প্রাক্কলন করা হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং গ্যাসের ঘাটতির কারণে তুলনামূলক ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার বাড়ায় সেই হিসাব নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ও সরকারের আর্থিক দায়—দুটিই বাড়তে পারে।
আরও পড়ুন: ১৬ বছরের শিক্ষার্থীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগ শিক্ষিকার বিরুদ্ধে
তেল-গ্যাসে ৩৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান:
জ্বালানি খাতের পৃথক হিসাবও উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি তেল কিনে দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি করায় গত আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। অন্যদিকে বাড়তি দামে এলএনজি আমদানির কারণে গত ছয় মাসে পেট্রোবাংলার লোকসান হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ফলে তেল ও গ্যাস—এই দুই খাতেই মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরের ব্যয় যুক্ত হলে এই অঙ্ক আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আরও পড়ুন: নেপালের জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেল থেকে ২ শ্রমিক উদ্ধার
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়লে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, আমদানি ব্যয় এবং সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ—সবই বাড়তে পারে।
ব্রেন্টের দাম ৯৬ ডলার ছাড়িয়েছে:
গত এক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও বেড়েছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৬ দশমিক ৬৩ ডলারে পৌঁছেছে।
জ্বালানি বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণপথ হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে।
কয়লার দামেও চাপ:
বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত কয়লার বাজারেও তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ। বাংলাদেশ প্রতিবছর বিদ্যুৎ খাতের জন্য ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রায় দেড় কোটি টন কয়লা আমদানি করে। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইন্দোনেশিয়ায় কয়লা উত্তোলন প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে।
এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমদানি করা কয়লার দামও বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রতি টন কয়লার দাম ১১০ ডলার থেকে বেড়ে ১৪০ ডলার পর্যন্ত হয়েছে। ফলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গ্যাস সংকটে ফার্নেস অয়েল:
দেশে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে গ্যাসের তুলনায় ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেশি। ফলে গ্যাসের ঘাটতি পূরণে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়লে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে পিডিবির আর্থিক অবস্থার ওপর।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, গত জুনে বিদ্যুতের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। এর ফলে সরকারের লোকসান কমবে বলে প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সেই সুফলকে অনেকটাই অনিশ্চিত করে তুলেছে।
জনগণ ও শিল্প—দুই দিক সামলানোর চ্যালেঞ্জ:
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সরকার ও জনগণ উভয়কেই জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ থাকলেও আগামী কয়েক মাস তুলনামূলক বেশি দামে তেল ও এলএনজি আমদানি করে শিল্পকারখানার উৎপাদন সচল রাখার প্রয়োজন হতে পারে।
তিনি বলেন, শীত মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে জ্বালানি ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের দুর্ভোগ, শিল্প উৎপাদন ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি:
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলেও এর অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলায় নীতিগত প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। জ্বালানি আমদানির ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এবং শিল্পের জ্বালানি চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারের সামনে একই সঙ্গে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ—বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, শিল্প উৎপাদন সচল রাখা, ভর্তুকি ও লোকসান নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ না দেওয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা সমন্বয় করা গেলে বৈশ্বিক বাজারের ধাক্কা কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দ্রুত প্রশমিত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যয় এবং সরকারের আর্থিক চাপ—দুটিই আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।





