সিএনএনের বিশ্লেষণ

সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলা, হুথিদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেবে রিয়াদ?

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৩৬ পূর্বাহ্ন, ১২ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:৪২ পূর্বাহ্ন, ১২ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বর্ণনা করা এই ঘটনায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলার পর সৌদি আরবের সামনে সামরিক ও কূটনৈতিক—দুই ধরনের চ্যালেঞ্জই বেড়েছে।

হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সহায়তা করতে গত সপ্তাহে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব। তবে এখন পর্যন্ত হুথিরা নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। বরং সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা আরও বাড়ানোর হুমকি দিয়েছে গোষ্ঠীটি।

আরও পড়ুন: জিবুতির উপকূলে অভিবাসীবাহী নৌকা ডুবে নিহত ১৩৯, নিখোঁজ ৮৪

ইরানের সঙ্গে যুক্ত হুথিরা সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা বলছে। তাদের এমন তৎপরতায় আঞ্চলিক সংঘাতের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে হুথিদের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। ইয়েমেনে গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে রিয়াদের প্রায় এক দশকের সামরিক অভিযান সেই বিরোধকে আরও গভীর করেছে।

সৌদি আরবের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত

আরও পড়ুন: সৌদি আরবের দাম্মাম বিমানবন্দরে হুথিদের হামলা

হুথিদের সামরিক অগ্রযাত্রা ঠেকাতে গত ১১ বছর ধরে অভিযান ও আলোচনার পথ অনুসরণ করেছে সৌদি আরব। কিন্তু প্রতিবেশী ইয়েমেনে গোষ্ঠীটি বেশ কয়েকটি বড় শহরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং তাইজের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

সৌদি রাজনীতি বিষয়ক লেখক ও বিশ্লেষক আলী শিহাবি সিএনএনকে বলেন, হুথিদের হুমকি মোকাবিলা করা জরুরি। তবে এ ক্ষেত্রে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ময়দানে কতটা সফল হয়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। সৌদি আরব বিমানশক্তি দিয়ে তাদের সহায়তা করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এখন পর্যন্ত সৌদি আরব মূলত হুথিবিরোধী ইয়েমেনি জোটকে আকাশপথে সহায়তা দিয়ে আসছে। ইয়েমেনের ভেতরে বড় আকারে নিজস্ব সেনা মোতায়েন করা থেকে বিরত রয়েছে দেশটি। রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার পর এই অবস্থান বদলাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ইয়েমেনে বিপুলসংখ্যক সৌদি সেনা পাঠানো হলে দুর্গম এলাকায় দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে দেশটি। এতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বিনিয়োগবান্ধব ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবকে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়িয়েছে হুথিরা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় দুই দশক আগেও হুথিরা ছিল ছোট একটি ধর্মীয় পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন। ইরানের সহায়তায় সময়ের সঙ্গে তারা শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তাদের হাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা দিয়ে ইসরায়েলের তেল আবিব পর্যন্ত হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে তারা।

হুথিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন লড়াই করা দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, গোষ্ঠীটি তাদের যুদ্ধকৌশল উন্নত করেছে। হামলায় প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং ধারাবাহিক আক্রমণের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রগতি হয়েছে।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলির অভিযোগ, হুথিরা ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। তার দাবি, নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দ্রুতগতিতে উড়তে পারে এবং তাপ শনাক্তকারী ব্যবস্থার মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যায়। তবে রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়।

ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে এআই ব্যবহারের অভিযোগ

হুথিদের অস্ত্র তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, উত্তর ইয়েমেনভিত্তিক একটি গোষ্ঠী তাদের ক্লড এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের দিকনির্দেশনা সফটওয়্যার তৈরিতে সহায়তা নিয়েছে।

তবে ওই গোষ্ঠীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তাদের অবস্থান হুথি-নিয়ন্ত্রিত উত্তর ইয়েমেনে হওয়ায় বিদ্রোহীদের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্রের বিষয়টি সামনে এসেছে। এ বিষয়ে সরাসরি নিশ্চিত প্রমাণের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে সৌদি আরব

হুথিদের মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সমর্থন চাইছে সৌদি আরব। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তান সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তুরস্কের মতো কয়েকটি মিত্র দেশও সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সিরিয়ার কাছ থেকেও সহায়তা চেয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে দেশটিতে ইরান-সমর্থিত কয়েকটি গোষ্ঠীকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত হুথিদের ওপর বিমান হামলায় সরাসরি অংশ নেয়নি। এর পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের জন্য শতাধিক সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হুথিদের একটি যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। এর ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে মার্কিন জাহাজ চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মাসে সৌদি যুবরাজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুইবার কথা বলে হুথিদের ওপর হামলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে তখন ট্রাম্প তাতে সম্মতি দেননি।

বিশ্লেষক আলী শিহাবির মতে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বিমানশক্তি ব্যবহার করলে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত হামলা চালানো সহজ হতে পারে।

মার্কিন নাগরিক নিহত, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

উন্নত মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পরও সৌদি আরবের বিস্তীর্ণ অবকাঠামো ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। মরুভূমিজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তেল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তুলনামূলক কম খরচে তৈরি একমুখী ড্রোনের লক্ষ্য হতে পারে।

সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় নিহতদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিকও ছিলেন। এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রকে সংঘাতে আরও সরাসরি যুক্ত করার চাপ বাড়াতে পারে।

হামলার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প ঘটনাটিকে ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেন। হুথিদের বিরুদ্ধে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা অংশ নিতে পারি।’

এ অবস্থায় সৌদি আরবকে একদিকে হুথিদের হামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।