নিষ্ঠুর নির্যাতিত কিশোরী গৃহকর্মী ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে
স্ত্রীর সহ সাবেক বিমান এমডির ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন, দুর্নীতি অনুসন্ধান
বাংলাদেশ বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শফিকুর রহমান এবং তার স্ত্রী বীথি কে কিশোরী গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় মামলায় সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। পুলিশ ঘটনার পরপরই শিশুটির পিতা গোলাম মোস্তফার দায়ের করা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় চাকুরী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে এমডিকে।
গ্রেফতারকৃতরা হলো- ১। বিথী (৩৭) ২। শফিকুর রহমান (৬৬) ৩। সুফিয়া (৫৫) ও ৪। রুপালি (৩৫)।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি সোমবার স্বাক্ষরিত হবে
উত্তরা পশ্চিম থানা সূত্রে জানা যায়, সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাত আনুমানিক ৩:৩০ ঘটিকায় রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
থানা সূত্রে আরও জানা যায়, জনৈক গোলাম মোস্তফা একজন হোটেল কর্মচারী। আর্থিক দুরবস্থার কারণে তিনি তার একমাত্র কন্যাকে (১১) গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় একটি বাসায় শিশু দেখাশোনার কাজে রাখেন। ওই বাসার মালিক বীথি ও তার স্বামী শফিকুর রহমান ভবিষ্যতে শিশুটির ভরণপোষণ ও বিবাহের দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দেন। এ আশ্বাসে ২০২৫ সালের জুন মাসে তিনি তার মেয়েকে তাদের হেফাজতে রেখে যান।
আরও পড়ুন: রমজানে অফিস চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত
প্রথমদিকে গোলাম মোস্তফা নিয়মিত মেয়ের সঙ্গে দেখা করলেও ২০২৫ সালের নভেম্বরের পর থেকে বিভিন্ন অজুহাতে তাকে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হতো না। সর্বশেষ শনিবার (৩১ জানুয়ারি ২০২৬) দুপুরে বীথি ফোন করে জানায় যে, শিশুটি অসুস্থ এবং তাকে নিয়ে যেতে হবে। ওই দিন সন্ধ্যায় শিশুটিকে বাবার কাছে হস্তান্তর করা হলে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত ও দগদগে পোড়া চিহ্ন দেখা যায়। সে স্বাভাবিকভাবে কথাও বলতে পারছিল না। আঘাতের কারণ জানতে চাইলে অভিযুক্তরা কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি।
পরবর্তীতে শিশুটিকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, গাজীপুরে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাকালে শিশুটি জানায়, ২০২৫ সালের ২ নভেম্বরের পর থেকে বীথি, শফিকুর রহমান এবং আরও দুইজন কাজের মহিলা বিভিন্ন সময়ে তাকে মারধর করে এবং রান্নার কাজে ব্যবহৃত গরম খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেয়।
এ ঘটনায় ডিএমপির উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এমডি ও সিইও শফিকুর রহমান এবং তার স্ত্রী বীথিসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়।
নিষ্ঠুর সহিংসতার শিকার শিশুটি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসক আব্দুস সালাম সরকার জানান, শিশুটিকে আরও এক সপ্তাহ হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা করতে হবে। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে নির্যাতিত এই শিশুটি।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মেয়েটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে পোড়া ক্ষত, গভীর জখম ও সেলাইয়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে। যা দীর্ঘমেয়াদি নির্যাতনের ইঙ্গিত দেয়। তার শারীরিক অবস্থা এখনো বেশ উদ্বেগজনক। তবে সে অনেকটা স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করতে পারছে।
শিশুটির সঙ্গে তার দাদি ও বাবা রয়েছেন। তার বাবা জানান, ৮ মাস আগে শফিকুর ও তার স্ত্রী বীথির বাসায় তাকে কাজে দিয়েছিলেন। প্রথম কয়েক মাস মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগে কোনো সমস্যা হয়নি। তবে ৩১ জানুয়ারি হঠাৎ করে বীথি ফোন করে মেয়েকে নিয়ে যেতে বলেন। তাকে আনতে বাসায় গেলে বীথি তার সঙ্গে কোনো কথা না বলে কৌশলে একটি সাদা কাগজে সই করিয়ে নেন। পরে যখন মেয়েকে তার হাতে তুলে দেওয়া হয়, তখন মেয়ের শারীরিক অবস্থা দেখে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এরপর গণমাধ্যমের সহযোগিতায় হাসপাতালে ভর্তি করান।
ভুক্তভোগী শিশু জানায়, তাকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না এবং দিনের অধিকাংশ সময় বাথরুমে আটকে রাখা হতো। সেখানে ক্ষুধার যন্ত্রণায় বাধ্য হয়ে টিস্যু খেত। এছাড়া মারধরের পাশাপাশি গরম খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো।
এদিকে শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে শফিকুর রহমানের নিয়োগ বাতিল করেছে সরকার। মঙ্গলবার বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে তার নিয়োগ বাতিলের বিষয়টি জানানো হয়। একই আদেশে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. হুমায়রা সুলতানাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এমডি ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
একই দিনে সাবেক এমডি ও তার স্ত্রী বীথির সম্পদের খোঁজে নেমেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ট্যাক্স গোয়েন্দা বিভাগ। তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের নামেও কোনো অঘোষিত বা গোপন সম্পদ রয়েছে কিনা, তা অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার শফিকুর ও বীথির ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য জানতে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে এনবিআরের ইনকাম ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ইউনিট।





