জেন–জি প্রভাবিত বিশ্বের প্রথম নির্বাচন বাংলাদেশে: রয়টার্স

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৪৮ অপরাহ্ন, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১২:৫১ পূর্বাহ্ন, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বাচনকালীন সময়ে রাজপথে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির দৃশ্যমান উপস্থিতি ছিল সীমিত। কখনো নির্বাচন বর্জন, কখনো শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে বিরোধী দলগুলোকে কোণঠাসা করা হতো। তবে আসন্ন বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করছে, ২০০৯ সালের পর এবারই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একটি প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: আজকেরটাই সম্ভবত শেষ ব্রিফিং: প্রেস সচিব

বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এগিয়ে থাকলেও ইসলামী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন একটি জোট শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ৩০ বছরের নিচের জেন–জি কর্মীদের নিয়ে গঠিত একটি নতুন রাজনৈতিক দল—যারা শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিল—স্বতন্ত্রভাবে ভোটব্যাংক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে তার দল এবং সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে তারা আত্মবিশ্বাসী।

আরও পড়ুন: নির্বাচনের কয়েক ঘণ্টা আগে ডিসিদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে তোলপাড়

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে একটি স্পষ্ট ও শক্তিশালী রায় পাওয়া বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের প্রধান শিল্পখাত—বিশেষ করে বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানি শিল্প—গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই নির্বাচনের ফলাফল শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তি ভারত ও চীনের প্রভাবের ভারসাম্যেও পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসি বলেন, “মতামত জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও এখনো বিপুলসংখ্যক ভোটার সিদ্ধান্তহীন। বিশেষ করে জেন–জি ভোটাররা—যারা মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ—নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।”

দেশজুড়ে বর্তমানে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ এবং জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পোস্টার ও ব্যানার চোখে পড়ছে। দলীয় কার্যালয় থেকে ভেসে আসছে প্রচারসংগীত। একসময় সর্বত্র আধিপত্য বিস্তার করা আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকের অনুপস্থিতি এবার স্পষ্ট।

জরিপগুলোতে ইঙ্গিত মিলছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেতে পারে, যদিও দলটি সরকার গঠনে নাও আসতে পারে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া দলটি বর্তমানে ভোটারদের কাছে তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের ভারতঘেঁষা রাজনীতির অবসানের পর ভারতের প্রভাব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে এবং সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে চীন। বিএনপিকে তুলনামূলকভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় আগ্রহী মনে করা হলেও, জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার এলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জামায়াতের জেন–জি মিত্র দল ইতোমধ্যে ‘নয়া দিল্লির আধিপত্য’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং তাদের নেতারা সম্প্রতি চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। যদিও জামায়াতের দাবি, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতি ঝুঁকতে চায় না।

অন্যদিকে, বিএনপির তারেক রহমান বলেছেন, তার দল ক্ষমতায় এলে যেসব দেশ বাংলাদেশের জনগণ ও জাতীয় স্বার্থে উপযোগী প্রস্তাব দেবে, তাদের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।

১৭৫ মিলিয়ন মানুষের দেশ বাংলাদেশ বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং বিনিয়োগ হ্রাসের চাপে রয়েছে। এসব কারণে ২০২২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থায়ন নিতে হয়েছে।

ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর এক জরিপে দেখা গেছে, ১২৮ মিলিয়ন ভোটারের প্রধান উদ্বেগ দুর্নীতি ও মূল্যস্ফীতি। ধর্মীয় ইস্যুর চেয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসনকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ভোটাররা।

প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাকিব বলেন, “মানুষ আওয়ামী লীগে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ভোট দেওয়ার অধিকারই ছিল না। আমি আশা করি, নতুন সরকার—যেই আসুক—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।”

সূত্র: রয়টার্স