নিজ কন্যাকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ: মায়ের স্বীকারোক্তি, পলাতক বাবার খোঁজে পুলিশ
নিজের পছন্দে বিয়ে করা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার পর তাকে কেন্দ্র করে পারিবারিক বিরোধের জেরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে খুলনায়। পুলিশ বলছে, মারধর ও মাথায় আঘাতে মৃত্যুর পর ১৬ বছর বয়সী কিশোরীর মরদেহ বস্তাবন্দি করে রাতের আঁধারে সড়কে ফেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় নিহতের মাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন। অপরদিকে অভিযুক্ত বাবাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
শনিবার সকালে কেএমপি সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কর্মকর্তারা এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরেন। তারা জানান, নিহতের মা আরিফা ইয়াসমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশের দাবি। পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। তবে মামলার অপর প্রধান অভিযুক্ত নিহতের বাবা আলিম হোসেন এখনও পলাতক। তাকে গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে: তথ্য প্রতিমন্ত্রী
পুলিশ জানায়, আরফানা হোসেন স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। কয়েকদিন আগে সে নিজের পছন্দে একজনকে বিয়ে করে। কিন্তু বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ায় তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা হয়। বাড়িতে ফেরার পরও সে স্বামীর কাছে যেতে চাইলে পরিবারের সঙ্গে তার বিরোধ চরমে ওঠে।
তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনার দিন এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে মা আরিফা ইয়াসমিন মেয়েকে মারধর করেন। পরে বাবা আলিম হোসেন কাঠের ফালি দিয়ে মাথায় আঘাত করলে গুরুতর আহত হয়ে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর ঘটনাটি আড়াল করতে মরদেহ গুমের পরিকল্পনা করা হয়।
আরও পড়ুন: ফরিদপুরে বাসচাপায় ৫ নিহত, বিক্ষুব্ধ জনতার আগুনে পুড়ল ৪ যানবাহন
পুলিশের দাবি, হত্যার পর আরফানার মরদেহ কবুতরের খাবার বহনে ব্যবহৃত একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরা হয়। পরে মোটরসাইকেলে করে খুলনা সদর থানার প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কে নিয়ে বস্তাবন্দি মরদেহ ফেলে রেখে আসেন নিহতের বাবা।
গত বুধবার রাত প্রায় ৯টার দিকে ওই সড়কে একটি বস্তার ভেতর থেকে রক্ত বের হতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশের কাছে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বস্তা খুলে এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে। সুরতহাল শেষে মরদেহ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
প্রথমদিকে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে ১০ জুলাই খুলনা সদর থানার পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করে। তদন্ত চলাকালে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং স্থানীয় অনুসন্ধানের একপর্যায়ে নিহতের মা থানায় গিয়ে মরদেহটি তার মেয়ের বলে শনাক্ত করেন।
পরে তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ আরফানার বাসায় গিয়ে তার মাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তিনি বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলেও একপর্যায়ে হত্যার ঘটনার বর্ণনা দেন। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আদালতে হাজির করলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে জানানো হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টারও ইঙ্গিত দেয়। হত্যার পর মরদেহ বস্তাবন্দি করে নির্জন সড়কে ফেলে রেখে পরিচয় গোপনের চেষ্টা করা হয়েছে। তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা হয়েছে কি না এবং ঘটনার আগে-পরে কারও সহায়তা নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে কেএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, মামলার তদন্ত দ্রুত এগিয়ে চলছে। পলাতক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে আদালতে শক্তিশালী অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের মতে, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বর্তমানে মামলাটি হত্যা এবং প্রমাণ লোপাট-সংক্রান্ত অভিযোগের দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে তদন্তাধীন রয়েছে।





