কাপ্তাইয়ে পাহাড়ধস ও ঢলে ১০ হাজার মানুষ কর্মহীন: বিদ্যুৎহীন চন্দ্রঘোনায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট

Sanchoy Biswas
রিদুয়ান সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ৬:৫৯ অপরাহ্ন, ১১ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১১:২০ অপরাহ্ন, ১১ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় টানা কয়েক দিনের অবিরাম ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। পাহাড়ধস, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও জলাবদ্ধতার কারণে উপজেলার প্রায় ১০ হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। কৃষিকাজ, মাছ চাষ, দিনমজুরি ও গবাদিপশু পালনসহ সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ায় দুর্গত এলাকার মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আশঙ্কা, জরুরি ত্রাণ ও সরকারি সহায়তা দ্রুত না পৌঁছালে কাপ্তাইয়ে বড় ধরনের মানবিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

এদিকে, টানা পাঁচ দিন ধরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে চন্দ্রঘোনা ইউনিয়ন। বিদ্যুৎ না থাকায় পাম্প চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে চন্দ্রঘোনা ও আশপাশের এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ছড়া ও বৃষ্টির ঘোলা পানি ব্যবহার করছেন, যার ফলে এলাকায় ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে: তথ্য প্রতিমন্ত্রী

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টিতে উপজেলার অন্তত ৩২টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে পাহাড়ি সড়ক ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং চারজন আহত হয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সরিয়ে নিতে প্রশাসন ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খুললেও শনিবার পর্যন্ত সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন মাত্র ৩১৭ জন। অনেকে জীবনঝুঁকি জেনেও ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহা দেখাচ্ছেন। বর্তমানে কর্ণফুলী সরকারি ডিগ্রি কলেজে ৭৩ জন, কর্ণফুলী স্টেডিয়ামে ৩০ জন, কাপ্তাই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৮৪ জন এবং মুরালীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩০ জন অবস্থান করছেন।

পাহাড়ি ঢলে রাইখালী ও ওয়াগ্গাসহ বিভিন্ন এলাকার ফসলি জমি এবং রবি শস্যের খেত সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। রাইখালী ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মো. সামশুল আলম আক্ষেপ করে বলেন, “পাহাড়ে এবার যে সবজি চাষ করেছিলাম, ঢলে তার সব শেষ। খেতের ফসল বেঁচে সারা বছরের সংসার চলে, ঋণের টাকা শোধ করতে হয়। এখন সবকিছু হারিয়ে পথে বসে গেছি। নতুন করে চাষ শুরু করতে অন্তত এক মাস লাগবে, এই সময় পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব জানি না।”

আরও পড়ুন: ফরিদপুরে বাসচাপায় ৫ নিহত, বিক্ষুব্ধ জনতার আগুনে পুড়ল ৪ যানবাহন

ওয়াগ্গা ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা ওজিদ কারবারী জানান, ওয়াগ্গা ছড়ার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় কুকিমারা, শাক্তাজারী, বড়ইছড়ি বাজার ও রাইখালীসহ বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ি পাড়ার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ঘরে খাবার ও গবাদিপশুর খাদ্য না থাকায় মানুষ চরম বিপর্যয়ে পড়েছেন।

কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন জরুরি ভিত্তিতে রাস্তাঘাট মেরামত এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির জন্য সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়ে বলেন, কাপ্তাইয়ে প্রায় ১০ হাজার লোক সম্পূর্ণ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যাদের দ্রুত জরুরি ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজন।

চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের কলেজ এলাকার গৃহিণী মরিয়ম বেগম জানান, পাঁচ দিন ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় ডিপ টিউবওয়েল বন্ধ রয়েছে। এলাকায় এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানি নেই। মানুষ বাধ্য হয়ে বৃষ্টির ঘোলা পানি ফুটিয়ে বা না ফুটিয়েই খাচ্ছে।

চন্দ্রঘোনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেন জানান, মিতিঙ্গাছড়ি, কর্ণফুলী কলেজ এলাকা এবং কেপিএমের ফকিরাঘোনাসহ বিভিন্ন পাড়ার অবস্থা খুবই নাজুক। ঘরবাড়ি ভেঙে মানুষ চরম ঝুঁকিতে আছেন। এই মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত ও কর্মহীন পরিবারগুলোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে চাল ও শুকনো খাবার পৌঁছানো দরকার।

প্রশাসনের নজরদারি ও মাইকিং

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাপ্তাই উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং চালিয়ে যাচ্ছে। কাপ্তাই উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. রায়হানুল ইসলাম বলেন, “আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের জন্য তিনবেলা খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং চিড়া, মুড়ি, বিস্কুটসহ শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। দুর্যোগের কারণে যারা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, তাদের মধ্যে সরকারি সহায়তা হিসেবে চাল বিতরণের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে থাকা মানুষদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে।”