আটাব নির্বাচনে শুনানি ছাড়াই প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ!
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)-এর আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। সংগঠনের আপিল বোর্ডের তিন সদস্যের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক সদস্য অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও চার হেভিওয়েট প্রার্থীর আপিল খারিজ ও প্রার্থিতা বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।
শুধু তাই নয়, শুনানিতে উপস্থিত না থেকেও ওই সদস্য পরবর্তীতে আপিল রায়ের নথিতে স্বাক্ষর করেছেন—যা নিয়ে আইনি অঙ্গন এবং দেশের ট্রাভেল এজেন্সি মালিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যেই এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই এর সালিশি আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে বুধবার ‘মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ কর্মসূচি
জানা গেছে, আটাবের বর্তমান প্রশাসক ড. মো. সাইফুদ্দিনের মাধ্যমে গত ৮ই মার্চ যখন প্রশাসকের মেয়াদ উর্ত্তীর্ন হযেছে বা তিনি প্রশাসকের দ্বায়িত্বে ছিলেন না তখন অবৈধভাবে ৩ সদস্য বিশিষ্ট এই নির্বাচনী আপিল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া। বাকি দুই সদস্য হলেন-বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব চৌধুরী সামিয়া ইয়াসমিন এবং একই মন্ত্রণালয়ের উপনিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। এর আগে আটাবের নির্বাচনী বোর্ড চারজন হেভিওয়েট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করে। তারা হলেন-সভাপতি পদপ্রার্থী আব্দুস সালাম আরেফ, সভাপতি পদপ্রার্থী আফসিয়া জান্নাত সালেহ, সিলেট থেকে সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী জিয়াউর রহমান খান রেজওয়ান এবং চট্টগ্রাম থেকে সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া। এই অন্যায্য বাতিলের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে প্রার্থীরা নিজেদের প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল বোর্ডের কাছে আবেদন জানান। তবে চলতি বছরের গত ৩০ জুন এই চার প্রার্থীর আপিল আবেদনের ওপর হেয়ারিং (শুনানি) অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু নিয়মের তোয়াক্কা না করে ৩ সদস্যের বোর্ডের মধ্যে মাত্র ২ জন সদস্য উপস্থিত থেকে তড়িঘড়ি করে শুনানি সম্পন্ন করেন। বোর্ডের অন্যতম সদস্য চৌধুরী সামিয়া ইয়াসমিন ওইদিন শুনানিতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিলেন। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যেখানে আপিল বোর্ডটি ৩ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত এবং প্রত্যেকের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক, সেখানে একজন সদস্যকে ছাড়া কোনোভাবেই বোর্ডের আইনগত কার্যকারিতা থাকে না। ৩ সদস্য ছাড়া বোর্ড গঠিতই হতে পারে না। ফলে ২ জন মিলে শুনানির নামে এক প্রহসনের নাটক সাজিয়ে চার প্রার্থীর আবেদন খারিজের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন। এই অন্যায্য ও বেআইনি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী প্রার্থীরা এফবিসিসিআই-এর সালিশি আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলা চলাকালীন আপিল বোর্ডের অন্যতম সদস্য মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম নিজে স্বীকার করেছেন যে, ৩০ জুনের শুনানিতে তিনি এবং চেয়ারম্যান উপস্থিত থাকলেও চৌধুরী সামিয়া ইয়াসমিন উপস্থিত ছিলেন না। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে চৌধুরী সামিয়া ইয়াসমিন শুনানিতে উপস্থিত না থেকেও কীভাবে পরবর্তীতে আপিল রায়ের ডকুমেন্টে স্বাক্ষর করলেন? তিনি শুনানিই শোনেননি, তার সামনে কোনো পক্ষ যুক্তি উপস্থাপন করেনি; অথচ তিনি চূড়ান্ত রায়ে সই করে দিলেন! এই চরম জালিয়াতি ও জাজমেন্ট জালিয়াতির বিষয়টি সামনে আসায় এফবিসিসিআই-এর সালিশি আদালতের বিচারকেরা (সালিশি বিচারক) তীব্র উষ্মা ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এই বেআইনি স্বাক্ষরের বিস্তারিত ব্যাখ্যা তলব করেছে বলে জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহল ধারণা করছেন, কোনো বিশেষ পক্ষকে অবৈধ সুবিধা দিতে অথবা নিজেরা কোনো অনৈতিক সুবিধা (বেনিফিট) গ্রহণ করে এই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন আপিল বোর্ডের সদস্যরা, যা সরকারি চাকুরিজীবী হিসেবে একটি গুরুতর ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই জঘন্য জালিয়াতির বিরুদ্ধে যেকোনো সময় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন হতে পারে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, ভুক্তভোগী প্রার্থীরা এই অনিয়মের বিরুদ্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং মহামান্য আদালতের দ্বারস্থ হয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চৌধুরী সামিয়া ইয়াসমিন বলেন, শুনানির ৩০ মিনিট পর আমি উপস্থিত হই এবং সাক্ষর করি। একপ্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার উপরস্থ কর্মকর্তা মহোদয়ের একটি কাজে ছিলাম, তাই আসতে একটু দেরি হয়। আরেকটি প্রশ্ন করলে তিনি বলেন,সচিব স্যারের অনুমতি ছাড়া আমি কোনো বক্তব্য দিবো না। এরপর ফোন কেটে দেন। পরে একাধিবার চেষ্টা করলেও ফোন রিসির্ভ করেন নি।





