তিন বছরে তিন সরকার: শপথের মঞ্চে ইতিহাস গড়লেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী নজির স্থাপন করলেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। পরপর তিন বছরে—২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে—তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সরকারকে শপথবাক্য পাঠ করিয়ে তিনি গড়লেন অনন্য রেকর্ড। রাজনৈতিক উত্থান-পতন, অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে টালমাটাল সময় পার করা রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি একই মঞ্চে, ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান-কে শপথবাক্য পাঠ করান। একই সঙ্গে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদেরও শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি। আনুষ্ঠানিকতার পর রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা বিনিময় করেন; উপস্থিত ছিলেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা এবং কূটনীতিকেরা।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করলেন
২০২৪: নির্বাচিত সরকার থেকে অভ্যুত্থান
এর আগে ২০২৪ সালে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন শপথ পাঠ করান শেখ হাসিনা-এর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের। কিন্তু একই বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সেই সরকারের পতন ঘটে। দেশজুড়ে অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সাংবিধানিক শূন্যতা এড়াতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: শপথ গ্রহণের সঙ্গে ভেঙে গেল অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ
২০২৪: অন্তর্বর্তী অধ্যায়
অভ্যুত্থানের তিন দিন পর, ৮ আগস্ট, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। সেই সরকারকেও শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়কে নানা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সময় পার করতে হয়—দলগুলোর চাপ, জনমত, আন্তর্জাতিক নজরদারি—সবকিছুর মাঝেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২৬: নতুন অধ্যায়
দুই বছরের রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালে আবারও শপথের মঞ্চে রাষ্ট্রপতি। এবার তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান-কে শপথ পড়ালেন। এ শপথের মধ্য দিয়ে শুরু হলো নতুন সরকারের যাত্রা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিক তিন বছরে তিন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা, যা রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে।
সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রতীক
বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২৪ এপ্রিল ২০২৩ থেকে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদকে শপথ পাঠ করানো রাষ্ট্রপতির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তবে রাজনৈতিকভাবে অস্থির এক সময়পর্বে একই রাষ্ট্রপতির হাতে টানা তিনটি পৃথক সরকারের শপথ অনুষ্ঠান—রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ও সাংবিধানিক কাঠামোর স্থিতিস্থাপকতার এক প্রতীকী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্ষমতার পালাবদল গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া; কিন্তু অভ্যুত্থান-উত্তর পরিস্থিতি থেকে নির্বাচিত সরকারে প্রত্যাবর্তন—এই পূর্ণ চক্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকাই ছিল প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতি বজায় রাখার কেন্দ্রবিন্দু। তিন বছরে তিন সরকার—শপথের সেই ধারাবাহিকতা তাই এখন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।





