সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকান বন্ধে সরকারের নির্দেশ বহাল বাস্তবতায় মিশ্র চিত্র

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৯:১৭ অপরাহ্ন, ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১১:৪৭ অপরাহ্ন, ০৪ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জারি করা সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সব দোকান, বিপণিবিতান ও শপিংমল বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনা কঠোরভাবে বহাল রেখেছে সরকার। নির্দেশনা অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিতের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে বাস্তবতার সঙ্গে নির্দেশনার ফাঁক—প্রধান সড়কের বড় বিপণিবিতান বন্ধ থাকলেও আবাসিক এলাকার ভেতরে অধিকাংশ দোকানপাট চালু রয়েছে। এদিকে ব্যবসায়ীদের সময়সূচি শিথিলের দাবি আপাতত নাকচ করে দিয়েছে সরকার।

জ্বালানি সাশ্রয় ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় চাপ কমাতে সরকার যে নতুন সময়সূচি কার্যকর করেছে, তা বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শনিবার (৪ এপ্রিল) বিকেলে বিদ্যুৎ ভবনে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ স্পষ্টভাবে জানান, বিদ্যমান নির্দেশনা আপাতত বহাল থাকবে এবং সবাইকে তা মেনে চলতে হবে।

আরও পড়ুন: কেরানীগঞ্জে গ্যাস লাইটার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর শোক

মন্ত্রী ব্যবসায়ীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, জাতীয় স্বার্থে জ্বালানি সাশ্রয় এখন অগ্রাধিকার; তাই সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা ব্যবসায়ী সমাজের দায়িত্ব। তিনি এ-ও জানান, ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হবে, তবে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

ব্যবসায়ীদের দাবি প্রত্যাখ্যান

আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ডিজেল ও এলএনজি কিনছে সরকার

বৈঠকে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির পক্ষ থেকে দোকান খোলা ও বন্ধের সময় পুনর্বিবেচনার জোর দাবি জানানো হয়। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান টিপু বলেন, সামনে পহেলা বৈশাখ ও কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে বেচাকেনার চাপ বাড়বে। সে কারণে সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

তবে সরকার এ প্রস্তাব আপাতত নাকচ করে দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ সাশ্রয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পরিবর্তনের কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা নেই।

মাঠপর্যায়ে ‘মিশ্র বাস্তবতা’

সরকারি নির্দেশ কার্যকর হওয়ার দ্বিতীয় দিনেই রাজধানীতে এর বাস্তবায়নে ভিন্নধর্মী চিত্র দেখা গেছে। নির্ধারিত সময় সন্ধ্যা ৬টার পর প্রধান সড়কসংলগ্ন বড় শপিংমল ও বিপণিবিতানগুলো বন্ধ থাকলেও আবাসিক এলাকার ভেতরের দোকানপাট, হোটেল ও ক্যাফেগুলো স্বাভাবিকভাবে চালু রয়েছে।

প্রগতি সরণি এলাকার যমুনা ফিউচার পার্কসহ বড় বড় শপিংমল নির্ধারিত সময়েই বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে খিলক্ষেত ও উত্তরা এলাকার প্রধান সড়কঘেঁষা অধিকাংশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও বন্ধ ছিল।

অন্যদিকে, মহল্লাভিত্তিক বাজার ও দোকানগুলোতে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। স্থানীয় প্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান, খাবারের হোটেল, ক্যাফে এবং ছোট ব্যবসাগুলো সন্ধ্যার পরও খোলা রয়েছে এবং ক্রেতাদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য।

আইনি বাধ্যবাধকতা ও ব্যতিক্রম

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের সব দোকানপাট, বিপণিবিতান ও শপিংমল সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ রাখতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত পরিচালিত হচ্ছে এবং ব্যাংকের লেনদেন চলছে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত।

তবে কাঁচাবাজার, ফার্মেসি, হোটেলসহ জরুরি সেবার আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই বিধিনিষেধের বাইরে রাখা হয়েছে।

তবে, সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যদিও মাঠপর্যায়ে এখনো কঠোর নজরদারির পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

অর্থনৈতিক চাপ বনাম জ্বালানি বাস্তবতা

ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, প্রায় ৭০ লাখ দোকান মালিক এবং আড়াই কোটি কর্মচারীর জীবিকা এই সময়সূচির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাদের মতে, বিকেলের পরই মূল বেচাকেনা শুরু হয়, ফলে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকান বন্ধের বাধ্যবাধকতা ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করছে।

অন্যদিকে সরকার বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিকল্প নেই। ফলে অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন অপরিহার্য।

সরকারি নির্দেশনা ও বাস্তবতার এই দ্বৈত চিত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে—কেবল নির্দেশ জারি করাই যথেষ্ট নয়, কার্যকর প্রয়োগ ও বাস্তবসম্মত সমন্বয় জরুরি। আইন প্রয়োগের কঠোরতা বাড়ানো না হলে নির্দেশনার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে; আর ব্যবসায়ীদের দাবি উপেক্ষা করা হলে অর্থনৈতিক চাপ আরও তীব্র হতে পারে।