আইন মন্ত্রণালয় ঘিরে প্রভাবশালী চক্রের দৌরাত্ম্য

সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে শতকোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:১০ অপরাহ্ন, ২১ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৯:৫১ অপরাহ্ন, ২১ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিকে কেন্দ্র করে শতকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে আইন মন্ত্রণালয়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আইন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এই চক্রটি মোটামুটি টাকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জেলা ও সাব-রেজিস্ট্রার বদলি চক্রের বিপুল লাভবান হয়। এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটটি এখন ভোল পাল্টে নিজের বিএনপি পন্থী সেজে বেড়াচ্ছেন। বিএনপির প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতাদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করছেন। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে শত কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগটি উত্থাপন করা হলে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এই প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিলেও বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, খিলগাঁও এর সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। সরকার পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট সচিবালয়ে বিক্ষোভের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে তারা।

আরও পড়ুন: টেকসই ভবিষ্যতের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান

পরবর্তীতে কোনো নির্বাচন ছাড়াই একটি কমিটি পুনর্গঠন করা হয়, যেখানে নামমাত্র সভাপতি করা হয় চট্টগ্রামের জেলা রেজিস্টার খন্দকার জামিলুর রহমানকে। তবে আড়ালে থেকে পুরো নিয়ন্ত্রণ নেন মহাসচিব মাইকেল মহিউদ্দিন। তার হাত ধরেই শুরু হয় নতুন করে বদলি বাণিজ্য। সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার বদলি বাণিজ্যের আরেক হোতা জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ অবৈধ উপার্জনের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে।

বদলি বাণিজ্য ও প্রভাব বিস্তারে গাজীপুরের রেজিস্টার আব্দুল বাতেন সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে নিজে লাভজনক পোস্ট বাগিয়ে নেয়। আশুলিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার খাইরুল বাসার পাভেল পাঁচ আগস্ট পরবর্তী নিজেকে বৈষম্য দাবি করে পদ বাগিয়ে নিয়ে বিপুল লাভবান হয়। অনুসন্ধানে জানা যায় ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে এই চক্রটির ইন্ধনে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে অনেক কর্মকর্তাকে জিম্মি করে মদের হুমকি দিয়ে নিজেদের স্বার্থে যাবে আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

আরও পড়ুন: ভ্যাট রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়ায় অনিয়মে জড়িতদের ছাড় নয়

অভিযোগ রয়েছে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক কর্মস্থলে পদায়নের জন্য ২ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। ঢাকার খিলগাঁও, সাভার, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় পোস্টিং পেতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন কমিটির সদস্যদের কাছ থেকেও ২ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়, যা প্রভাবশালী মহলে পৌঁছে দেওয়া হতো। এর ফলে অনেক কর্মকর্তা এক মাসের মধ্যেই একাধিকবার বদলি সুবিধা পেয়েছেন।

এছাড়া বদলির পর পদে টিকে থাকতে মাসে ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাৎক্ষণিক বদলির হুমকি দেওয়া হতো বলেও জানা গেছে।

রাজধানীর অভিজাত রেস্তোরাঁ ও হোটেলে বসেই এই বদলি বাণিজ্যের দরকষাকষি হতো বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ সংক্রান্ত অডিও রেকর্ড থাকার দাবিও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কমিটির একাধিক সদস্যও পছন্দের পদায়ন পেয়েছেন। ঘন ঘন বদলির ফলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

ঘটনার প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আট মাসে ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ২০০ জন ঘুষের মাধ্যমে পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন পেয়েছেন। জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের তথ্যও উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় না আনা হলে প্রশাসনে দুর্নীতির এই ভয়াবহ চক্র আরও বিস্তার লাভ করতে পারে। এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন সূত্র জানায়, তাদের কাছে আসা বিভিন্ন অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে অনুসন্ধানের জন্য প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। কমিশন গঠন হওয়ার পরপরই এই অভিযোগগুলো উপস্থাপন করা হবে।