কৃষি উন্নয়নে ৭ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর
কৃষি উন্নয়নে বর্তমান সরকার সময়োপযোগী ৭ দফা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার বিকালে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তরকালে টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য রবিউল আলমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ৭ দফা পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন: ৫ বছরের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমরা যেটি সবাই দেখছি, আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে বিভিন্ন বিষয়—যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জমির পরিমাণ হ্রাস এবং প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা। এ সকল কারণে কৃষি খাত বিভিন্ন রকম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আমাদের এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই কৃষি উৎপাদন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষিকে টেকসই এবং লাভজনক খাতে রূপান্তর করার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। সমগ্র দেশবাসী দেখেছেন, আমরা ইতোমধ্যে ১৪ই এপ্রিল কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু করেছি, যা নির্বাচনের পূর্বে আমাদের একটি প্রতিশ্রুতি ছিল।’
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ১০টি সেবা, যথা—ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্রদান, স্বল্পমূল্যে কৃষিযন্ত্রপাতি সরবরাহ, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি বীমা সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুবিধা, কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য প্রাপ্তিসহ ফসলের রোগবালাই দমনের পরামর্শ প্রদান—ইত্যাদি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সকল কৃষক, অর্থাৎ ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষককে এ কার্ড প্রদান করা হবে।
আরও পড়ুন: নতুন বাস ভাড়া নিয়ে সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার: মন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী কৃষি উন্নয়নে সরকারের যে ৭ দফা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন, তা হলো—আধুনিক সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, পতিত জমি আবাদের আওতায় আনা এবং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতি চালু, কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ, কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা কার্যক্রম স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা, কার্ডের মাধ্যমে বীজ, সার, কৃষিযন্ত্রসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি প্রদান, স্বল্প সুদের কৃষিঋণ ও ফসল বীমা চালু, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম নির্মাণ, ফল ও সবজি সংরক্ষণের জন্য এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)-এর মাধ্যমে অধিক ফলনশীল, রোগপ্রতিরোধী ও স্বল্পমেয়াদি নতুন জাত উদ্ভাবন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ‘ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি’ বাস্তবায়ন, টেকসই কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার, কম সেচ, কম রাসায়নিক সার ও কম কীটনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রি-পেইড মিটার ও খামারি অ্যাপসের ব্যবহার।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকাল তিনটায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের প্রথম কর্মসূচি ছিল প্রথম ত্রিশ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষির উন্নয়নে বর্তমান সরকার আরও অনেকগুলো সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য সরকার উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল বীজ, সুষম সার ব্যবহারের পাশাপাশি আধুনিক সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এ জন্য ইতোমধ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে, যা আমরা আগামী পাঁচ বছরে বাস্তবায়ন করব। কৃষিযান্ত্রিকীকরণের ভর্তুকি প্রদান করে ট্রাক্টর, হারভেস্টার, রিপারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কৃষকদের কাছে সহজলভ্য করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পতিত জমি আবাদের আওতায় আনা এবং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া ও পরিবেশের উপযোগী ফসল নির্ধারণ করা হয়। ফলে জমির অপচয় কমে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে পতিত জমি চিহ্নিত করে সেগুলো আবাদের আওতায় আনার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার বৃদ্ধি করে পতিত জমি কৃষির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সিলেট অঞ্চলসহ চরাঞ্চলের পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনার জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণে সরকারের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক সময় ধাননির্ভর কৃষি ব্যবস্থা এখন ধীরে ধীরে ফল, সবজি, ডাল, তেলবীজ, মসলা ও ফুল চাষে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা কার্যক্রম স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য কৃষক কার্ডের মাধ্যমে বীজ, সার ও কৃষিযন্ত্র ক্রয়সহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি প্রদান করা হবে। তাছাড়া স্বল্প সুদের কৃষিঋণ ও ফসল বীমা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্যও বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। দেশের ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের কল্যাণে প্রতি অর্থবছর কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটে ‘কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা’ খাতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী জানান, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতে ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এ বরাদ্দ থেকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিতরণ বাবদ ৪০১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে, এতে ২৫ লাখ ২২ হাজার কৃষক উপকৃত হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া ফল ও সবজি সংরক্ষণের জন্য মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষিপণ্য রপ্তানির লক্ষ্যে উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং ক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকারের কার্যক্রমও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
‘মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির উদ্যোগ’
টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য রবিউল আউয়ালের একটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির একটি পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করছে। আপনি জানেন, রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে অনেক জায়গায় মাটির উর্বরতা কমে গেছে। এ জন্য মাটির পরীক্ষা করে ন্যানো সারের প্রয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে সারের খরচ কমে এবং মাটির উর্বরতা বজায় থাকে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় চুন প্রয়োগের মাধ্যমে মাটির অম্লতা নিয়ন্ত্রণ করে উর্বরতা বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
‘কৃষি শ্রমিকরাও সহযোগিতা পাবেন’
নেত্রকোনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাসুম মোস্তফার সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের কৃষক কার্ডের আওতায় আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষি শ্রমিকরাও পরোক্ষভাবে এই সহায়তার অংশীদার হবেন।
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আমরা যে অর্থনৈতিক সহায়তা দিচ্ছি, তার সুফল কৃষি শ্রমিকরাও পাবে।





