উচ্ছেদ হকারদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৬:৪৬ অপরাহ্ন, ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ৬:৪৬ অপরাহ্ন, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকায় উচ্ছেদ করা হকারদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পুনর্বাসন ছাড়া আর কোনো হকারকে বলপ্রয়োগে উচ্ছেদ না করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজধানী ঢাকার হকার ও শহরের ফুটপাতে ব্যবসারত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের জন্য একটি নীতিমালা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। কমিটি ইতোমধ্যে তাদের কাজও শুরু করে দিয়েছে। দ্রুতই এ নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। এ কমিটি গঠন করে সম্প্রতি অফিস আদেশ জারি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কমিটির আহ্বায়ক। সদস্য সচিব হলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব (সিটি-১)।

কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের দুই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এবং রাজউকের একজন পরিচালক সদস্য হিসেবে রয়েছেন। কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, এ কমিটি ঢাকা মহানগরীর হকারদের পুনর্বাসন ও ঢাকা শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য কমিটি ঢাকা শহরের ফুটপাতে ব্যবসারত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শৃঙ্খলায় আনার লক্ষ্যে মূল রাস্তা থেকে সুবিধাজনক স্থানে পুনর্বাসনের জন্য একটি নীতিমালা দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রণয়ন করে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর দাখিল করবেন।

আরও পড়ুন: দেশের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সোলার পাওয়ার হবে টেকসই সমাধান

এ বিষয়ে কমিটির সদস্য সচিব ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব (সিটি কর্পোরেশন-১) রবিউল ইসলাম বলেন, হকার ও ফুটপাতে ব্যবসারত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের জন্য একটি নীতিমালা করতে আমরা ইতোমধ্যে একটি সভা করেছি। আগামী সপ্তাহে আরও একটি সভা হবে। তিনি বলেন, আমরা এ বিষয়ে কাজ করছি। দ্রুতই নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। চূড়ান্ত করার পর এ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এই নীতিমালা দেওয়া হবে।

রাজধানীর ব্যস্ততম সড়ক ও ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করতে চলতি মাসের শুরুতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং দুই সিটি কর্পোরেশন সাঁড়াশি অভিযানে নামে। গত ১ থেকে ৫ এপ্রিল পূর্ব ঘোষণা দিয়ে এ অভিযান চালানো হয়।

আরও পড়ুন: প্রস্তুতি শেষে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন: সংসদে মির্জা ফখরুল

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, এ অভিযানে ফুটপাত দখলকারীদের কাছ থেকে ১১ লাখ ৩১ হাজার ৪৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া, ৪৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অবৈধ পার্কিংয়ের অভিযোগে ১৭০টি ভিডিও মামলা দেওয়া হয় এবং অবৈধভাবে স্থাপিত দোকান ও যানবাহনসহ বিভিন্ন মালামাল জব্দ করা হয়। অভিযানে গুলিস্তান, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাবসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত ও সড়কের দখলমুক্তি ঘটে। তাতে অনেকটা স্বস্তি ফিরে জনজীবনে। যদিও এটি বেশিদিন দখলমুক্ত থাকেনি। গুলিস্তান, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাবসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত আগের মতোই দখল করে এখন জামা-কাপড়, বই, জুতা, ফলসহ নানা পণ্য বিক্রি করছেন হকাররা। ট্রাফিক ও থানা পুলিশের সামনেই চলছে এসব কার্যক্রম। অতীতেও বহুবার উচ্ছেদ করা হয়েছে, কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা বা পুনর্বাসন না থাকায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই ফুটপাত ফিরে গেছে হকারদের দখলে। এজন্য একটি জাতীয় নীতিমালা তৈরি করে পুনর্বাসনের বহু দিন আগে থেকেই জানিয়ে আসছেন হকাররা। এ উপলক্ষে তারা বহু বছর ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন।

হকারদের পুনর্বাসনের নির্দেশ দিলেন প্রধানমন্ত্রী: রাজধানী ঢাকার সড়ক থেকে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের দ্রুত পুনর্বাসনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৫ এপ্রিল দুপুরে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে দ্রুত বিকল্প স্থান নির্ধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, উচ্ছেদ হওয়া হকারদের এমন জায়গায় পুনর্বাসন করতে হবে, যেখানে তারা স্বাচ্ছন্দ্য ও উৎসাহের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবেন। সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মিরপুর-১ এলাকা এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মতিঝিল, বায়তুল মোকাররম, পল্টন ও গুলিস্তানসহ কয়েকটি এলাকার সড়ক থেকে কয়েক শতাধিক দোকান উচ্ছেদ করা হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উচ্ছেদ হওয়া হকারদের বিকল্প জায়গা ব্যবস্থা করে দেবে সরকার। পাশাপাশি নিবন্ধনের মাধ্যমে হকারদের পরিচয়পত্র দেওয়া হবে, যাতে তাদের কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা যায়।

পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ চায় না হকাররা: পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ চান না রাজধানীর ফুটপাতের হকাররা। এ লক্ষ্যে গত ১৬ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ করে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন। সমাবেশে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল হাশিম কবির, সাধারণ সম্পাদক হযরত আলীসহ ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হকাররা বক্তব্য রাখেন। এসময় হকাররা জীবন-জীবিকা রক্ষার ১০ দফা দাবি জানান। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ করা যাবে না, হকারদের অর্থনৈতিক অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে, জীবিকা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে, হকারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি বন্ধ করে রাজস্ব আদায়, হকারদের ওপর মামলা-গ্রেপ্তার, দমন-পীড়ন-নির্যাতন বন্ধ, প্রকৃত হকারদের তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। এছাড়া দখল করা সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করে হকারদের বরাদ্দ দিয়ে হকারদের পুনর্বাসন, ৫ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ, জাতীয় বাজেটে হকারদের জন্য বরাদ্দ এবং হকার্স মার্কেটগুলোতে প্রকৃত হকারদের নামে বরাদ্দ দিতে হবে।

এদিকে, ফুটপাত হকারমুক্ত করতে এবং হকারদের পুনর্বাসনে রাজধানীতে ৮টি নৈশ মার্কেট চালুর পরিকল্পনা করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। সম্প্রতি রাজধানীর নগর ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম এ পরিকল্পনার কথা জানান। হকার উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন প্রসঙ্গে প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেটা চান, শুধু হুট করে উচ্ছেদ করলে হবে না। এদের একটা বিকল্প ব্যবস্থাও করতে হবে। সেটার জন্য ঢাকা শহরে আমরা ৮টি নৈশ মার্কেট করার চিন্তা করছি। নৈশ মার্কেট বলি বা যেটাই বলি, নৈশকালীন। অর্থাৎ, অফিস আওয়ারের পর বিকেল থেকে শুরু করে রাত ১২টার আগ পর্যন্ত সেখানে তাদের বসাতে চাই, যেন সারাদিন সব জায়গায় হকারদের মার্কেট না বসে।

প্রসঙ্গত, পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ এবং ফুটপাতে দোকান বসাতে না পারার কারণে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হকাররা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। হঠাৎ উচ্ছেদের ফলে হাজার হাজার হকার কর্মসংস্থান হারিয়ে পরিবারসহ অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। উচ্ছেদের শিকার প্রায় ৩০০ ভাসমান উদ্যোক্তা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঢুকতে পারছেন না। রোজগার হারিয়ে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তাঁরা। উচ্ছেদের নামে হয়রানি বন্ধ চান হকার ও ভাসমান উদ্যোক্তারা। সেখানে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের জীবন-জীবিকার পরিস্থিতি নিয়ে শুরু হওয়া জরিপের একটি ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশ করেছে জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠন।

জরিপের অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত ৫০ জন নারী-পুরুষ হকারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এতে উচ্ছেদের শিকার হওয়া নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক পানি বিক্রেতার পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। তাঁর স্ত্রী বর্তমানে সন্তানসম্ভবা। জীবিকা বন্ধ থাকায় ঘরভাড়া দিতে পারছেন না। এ কারণে বাড়িওয়ালা তাঁদের উচ্ছেদ করেছেন। জরিপে উঠে এসেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কেউ ৩০ বছর, কেউ ২০ বছর, আবার কেউ ৬ মাস ধরে হকারের পেশায় যুক্ত আছেন। যে ৫০ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ১০ জন নারী হকার বা ভাসমান উদ্যোক্তা রয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে হকার উচ্ছেদ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ, শ্রমিকনেতা ও মানবাধিকারকর্মীদের মতামত নিয়েছে জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন বাংলাদেশ। ব্যারিস্টার সাদিয়া আরমান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বন্ধ বিল্ডিং বা কোনো নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে নয়, বরং অনেক বিস্তৃত। এটি এ রকম একটা জায়গা, যেখানে নানা জায়গা থেকে নানা ধরনের মানুষ আসেন—প্রেমিক-প্রেমিকারা আসেন, সাধারণ মানুষ আসেন, নানা বয়সের মানুষ আসেন। যখন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, তখন থেকেই হকারদের এই সংস্কৃতি চলে আসছে। এই সংস্কৃতি যে তারা বন্ধ করবে, কেন বন্ধ করবে, সেটা বোঝাতে হবে। এখানে পাখি আসবে, কুকুর আসবে, এখানে ভিখিরি আসবে, হকার আসবে—সব ধরনের মানুষ এখানে আসতে পারে।

তবে জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শামীম ইমাম বলেন, পরিচ্ছন্নতা অভিযানের কথা বলে উচ্ছেদ করা হলেও এর মূল উদ্দেশ্য হলো শহর থেকে দরিদ্র মানুষদের উপস্থিতি মুছে ফেলা, বৃহৎ পুঁজির মালিকদের মুনাফা সম্প্রসারিত করা এবং শহরকে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার উপযুক্ত করে তোলা।

জরিপে অংশ নেওয়া হকার ও ভাসমান উদ্যোক্তারা চারটি সুপারিশ করেছেন। এগুলো হলো—

১. কয়েক দফায় ভাসমান উদ্যোক্তাদের হাঁড়িপাতিল নিয়ে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম। সেই সব মালামাল দ্রুত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।

২. কিছুদিন পরপর উচ্ছেদের নামে হয়রানি বন্ধ করা হোক। ভাসমান উদ্যোক্তাদের ওপর যে মানসিক-শারীরিক নির্যাতন করা হয়, অতি দ্রুত সেটি বিচারের আওতায় আনা হোক।

৩. প্রয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা সিটি কর্পোরেশন বা নিজেদের সমবায় বা ট্রেড ইউনিয়নের পরিচয়পত্র ব্যবহার করার ব্যবস্থা করা হোক।

৪. শুধু সন্দেহের বশে কোনো প্রমাণ ছাড়াই মাদক বিক্রেতা বা মাদক সেবনকারী আখ্যা দিয়ে যে হকারদের উচ্ছেদ করা হলো, তাঁদের আবার পুনর্বহাল করা হোক।