জনপ্রত্যাশার অন্তবর্তী সরকার কেন ব্যর্থ হলো: তিন প্রশ্নে হোসেন জিল্লুর
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। তাঁর মতে, বিপুল জনপ্রত্যাশা নিয়ে দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের ব্যর্থতার পেছনে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে দায়ী—আমলাতন্ত্রের সঙ্গে আপস, তরুণদের যথাযথ দিকনির্দেশনা না দিয়ে ক্ষমতার আকর্ষণের দিকে ঠেলে দেওয়া এবং নিজেদের গড়া সংস্কার প্রক্রিয়াকেই শেষ পর্যন্ত পরিত্যাগ করা।
হোসেন জিল্লুর রহমানের পর্যবেক্ষণ, জুলাই অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল সংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং জবাবদিহিমূলক শাসন প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সাহস ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি।
আরও পড়ুন: আগামী সপ্তাহেই বাংলাদেশে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ প্রতিষ্ঠানের ৪৫ শীর্ষ ব্যবসায়ী
শনিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। যুক্তরাজ্যের সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন পরিচালিত আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী গবেষণা কনসোর্টিয়াম সোয়াস অ্যান্টি–করাপশন এভিডেন্স এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সভায় সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুশতাক খান ও অধ্যাপক পল্লবী রায় এক-এগারো এবং জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
জনতার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্রযন্ত্রে পুরোনো কাঠামো
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একগুচ্ছ বার্তা
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রকে নতুনভাবে সাজানোর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত গভীর। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও রক্ষণশীল পথ বেছে নেয়।
তাঁর মতে, রাষ্ট্রের পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ওপরই অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে সরকার। পুরোনো আমলাতন্ত্রের সংস্কার না করে একই ধরনের আমলাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানোয় রাষ্ট্রযন্ত্রের মৌলিক চরিত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান যে রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্ন সামনে এনেছিল, আমলাতন্ত্রের সঙ্গে সরকারের আপস সেই পরিবর্তনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
হোসেন জিল্লুর রহমানের ভাষায়, অন্তর্বর্তী সরকার বুঝতে পারেনি—কোন সময় সাহসী ও মৌলিক সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ফলে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, সেটি ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।
তরুণদের নেতৃত্ব, কিন্তু নেতৃত্বের বিকাশ কোথায়?
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম বড় শক্তি ছিল তরুণ প্রজন্ম। তাঁদের নেতৃত্ব, অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগই আন্দোলনকে ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর সেই তরুণদের রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন হোসেন জিল্লুর রহমান।
তাঁর মতে, তরুণদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব, রাজনৈতিক শৃঙ্খলা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা গড়ে তোলার পরিবর্তে সময়ের সঙ্গে তাঁদের মধ্যে ক্ষমতার প্রতি একধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, তরুণদের যথাযথ দিকনির্দেশনা না দেওয়ার কারণে নেতৃত্ব বিকাশের জায়গায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ক্ষমতা কীভাবে অর্জন করতে হয়—তার চেয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে শক্তিশালী করতে হয়, রাষ্ট্রকে কীভাবে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্ব কীভাবে তৈরি করতে হয়—এসব বিষয়ে তরুণদের প্রস্তুত করা জরুরি ছিল।
তাঁর পর্যবেক্ষণ, সমাজে শিক্ষার গুরুত্ব কমে যাওয়ার একটি প্রবণতাও তৈরি হয়েছে। অথচ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জ্ঞান, শিক্ষা, যুক্তিবোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বিকল্প নেই।
সংস্কারের কথা বলে সংস্কারই ছুড়ে ফেলা
অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার আরেকটি জায়গা হিসেবে সংস্কার প্রক্রিয়াকে চিহ্নিত করেছেন হোসেন জিল্লুর রহমান। তাঁর অভিযোগ, সরকার সংস্কারের কথা বললেও সংস্কারের প্রতি প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক আন্তরিকতা দেখাতে পারেনি।
তাঁর মতে, অন্তর্বর্তী সরকার একদিকে ‘সংস্কার’ শব্দটিকে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে, অন্যদিকে নিজেদের গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সরকার যে সংস্কার কমিশনগুলো গঠন করেছিল, সেসব কমিশনের সুপারিশের অনেক কিছুই তারা আমলে নেয়নি। কার্যত সেগুলো ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সরকার একটি ‘রিফর্ম গেম’ খেলেছে।
অর্থাৎ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জনমনে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হলেও কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরকার শেষ পর্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নেয়নি—এমনটাই তাঁর বক্তব্যের সারকথা।
গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসের সুযোগ নেই
হোসেন জিল্লুর রহমানের বক্তব্যে মূলত উঠে এসেছে—জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের সামনে যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা কেবল সরকার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল একটি কার্যকর, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা।
কিন্তু আমলাতন্ত্রের পুরোনো কাঠামোর ওপর নির্ভরতা, তরুণ নেতৃত্বকে সঠিকভাবে প্রস্তুত করতে না পারা এবং সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি সেই সম্ভাবনাকে দুর্বল করেছে বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট—গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, কোনো সরকারই তার বিকল্প হতে পারে না। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের মালিকানা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, ক্ষমতার জবাবদিহি এবং কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত না হলে শুধু সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে না।
এক-এগারোর অভিজ্ঞতা থেকে জুলাই—দুই সময়ের তুলনা
হোসেন জিল্লুর রহমান ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারেরও উপদেষ্টা ছিলেন। ২০০৭ সালে দেশের রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে জরুরি অবস্থা জারির পর ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালন করা ওই সরকারের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতারও একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে।
তবে দুই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। এক-এগারোর সময় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর সামরিক বাহিনীর প্রভাব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও জুলাই অভ্যুত্থান ছিল তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত একটি ব্যাপক গণআন্দোলন, যার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে এবং নতুন রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের প্রত্যাশা তৈরি হয়।
সেই জায়গা থেকেই হোসেন জিল্লুর রহমানের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ—যে তরুণেরা রাষ্ট্র পরিবর্তনের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল, তাঁদের জন্য কী ধরনের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ তৈরি করা হলো? যে সংস্কারের প্রত্যাশায় মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, তার কতটা বাস্তবায়ন হলো? আর পুরোনো রাষ্ট্রযন্ত্রের জায়গায় নতুন জবাবদিহিমূলক কাঠামো কতটা প্রতিষ্ঠিত হলো?
ক্ষমতার পালাবদল নয়, রাষ্ট্রের চরিত্র বদলই ছিল প্রত্যাশা
জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় জনগণের প্রত্যাশা ছিল ব্যাপক। রাজনৈতিক দল, তরুণ প্রজন্ম, নাগরিক সমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন নিয়ে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছিল।
পরবর্তীতে প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালন করে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিদায় নেয় এবং ভোটের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসে।
কিন্তু হোসেন জিল্লুর রহমানের বক্তব্যে উঠে এসেছে, একটি নির্বাচনের আয়োজন করাই জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ সাফল্য নয়। নির্বাচন গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, কার্যকর রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ক্ষমতার ওপর সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ।
তাঁর মূল্যায়ন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সেই পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
তিন ব্যর্থতার সারকথা
হোসেন জিল্লুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার তিনটি প্রধান ক্ষেত্র হলো—
এক. পুরোনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে আপস করে রাষ্ট্রযন্ত্রে মৌলিক পরিবর্তন না আনা;
দুই. জুলাই অভ্যুত্থানের প্রধান শক্তি তরুণদের যথাযথ গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত না করে ক্ষমতার আকর্ষণের দিকে ঠেলে দেওয়া;
তিন. সংস্কারের নামে কমিশন ও প্রক্রিয়া তৈরি করেও শেষ পর্যন্ত নিজেদের সংস্কার-সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর রাজনৈতিক সদিচ্ছা না দেখানো।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের সামনে যে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সেই সম্ভাবনা কতটা বাস্তবে রূপ নিয়েছে—হোসেন জিল্লুর রহমানের এই মূল্যায়ন মূলত সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। তাঁর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত বার্তা হলো, গণতন্ত্র শুধু ক্ষমতার হাতবদল নয়; গণতন্ত্র মানে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে জনগণের কাছে জবাবদিহির মধ্যে আনা, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং ক্ষমতাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বাইরে নিয়ে যাওয়া।





