সৌদিতে প্রবাসীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান, এক সপ্তাহে গ্রেপ্তার ১৪ হাজার
সৌদি আরবে অবৈধভাবে বসবাস ও কাজ করা প্রবাসীদের বিরুদ্ধে ফের নতুন করে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মাত্র এক সপ্তাহে ১৪ হাজার ১৫৪ জন প্রবাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১২ হাজার ৬১৩ জনকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। দেশটির এই কঠোর অভিযানে সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যেও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যদিও সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্যের কোথাও ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের জাতীয়তা উল্লেখ করা হয়নি, দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী থাকায় চলমান অভিযান তাঁদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যাঁদের আবাসন, কাজের অনুমতি, নিয়োগকর্তা পরিবর্তন কিংবা অন্যান্য কাগজপত্রে সমস্যা রয়েছে, তাঁদের মধ্যে শঙ্কা বাড়ছে।
আরও পড়ুন: মার্কিন ও ইসরায়েলি স্থাপনায় ইরানের পাল্টা হামলার ব্যাপক প্রস্তুতি
শনিবার সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ২৩ থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে এসব প্রবাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আবাসন আইন লঙ্ঘন
আরও পড়ুন: ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় বড় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল
সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া ১৪ হাজার ১৫৪ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭ হাজার ১০৩ জন আবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক হয়েছেন। এ ছাড়া ৩ হাজার ৬৫৪ জন সীমান্ত নিরাপত্তা আইন এবং ৩ হাজার ৩৯৭ জন শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
অর্থাৎ, সৌদি আরবে বৈধভাবে অবস্থান ও কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলার বিষয়টি দেশটির কর্তৃপক্ষ এখন অত্যন্ত কঠোরভাবে দেখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা হলো বৈধ কাগজপত্রের ঘাটতি, অনুমোদন ছাড়া কাজ করা, নিয়োগকর্তার নির্ধারিত শর্তের বাইরে কর্মসংস্থান এবং আবাসনসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন। চলমান অভিযানে এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেই ব্যাপক ধরপাকড় হচ্ছে।
বাংলাদেশিদের জন্যও সতর্কবার্তা
সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারগুলোর একটি। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে যান। নির্মাণ, পরিবহন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, রেস্তোরাঁ, কারখানা, গৃহস্থালি ও বিভিন্ন সেবা খাতে বাংলাদেশিরা কর্মরত রয়েছেন।
ফলে সৌদি সরকারের এমন ব্যাপক অভিযান বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীরা গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
তবে বর্তমান অভিযানে গ্রেপ্তার বা ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি, সে বিষয়ে সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
এ কারণে বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর পরিবর্তে সংশ্লিষ্টদের বৈধ কাগজপত্র, কর্মঅনুমতি ও আবাসনসংক্রান্ত নিয়মকানুন মেনে চলার বিষয়ে সতর্ক হওয়াই জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।
সীমান্তে আরও ১ হাজার ৪১৮ জন আটক
অভিযান শুধু সৌদি আরবের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশটিতে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অবৈধভাবে সৌদি আরবে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় আরও ১ হাজার ৪১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে বেআইনিভাবে সৌদি আরব থেকে বের হওয়ার চেষ্টার সময় ২৩ জনকে আটক করা হয়েছে।
এ ছাড়া অবৈধভাবে অবস্থানরত বা কর্মবিধি লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিদের পরিবহন ও আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে কর্তৃপক্ষ।
ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় আরও হাজারো প্রবাসী
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমানে ৩০ হাজার ৬৭৯ জন ব্যক্তি আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ১৭ হাজার ৯০৩ জনকে প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথিপত্র সংগ্রহের জন্য তাঁদের নিজ নিজ দেশের কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো হয়েছে। আরও ৫ হাজার ৪২৪ জনকে দেশে ফেরার আগে ভ্রমণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, সৌদি আরবে অবৈধ অভিবাসন ও শ্রম আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অভিযান শুধু সাময়িক ধরপাকড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আটক ব্যক্তিদের শনাক্ত করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সহায়তা করলেও জেল-জরিমানা
সৌদি আরবে অবৈধভাবে প্রবেশে সহায়তা করা, আশ্রয় দেওয়া বা পরিবহন করার ক্ষেত্রেও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
দেশটির আইন অনুযায়ী, অবৈধভাবে কাউকে সৌদি আরবে প্রবেশে সহায়তা করার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিক ও বিদেশি বাসিন্দাদের এ বিষয়ে নিয়মিত সতর্ক করে আসছে। অবৈধভাবে অবস্থানকারী বা আইন লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিদের কোনো ধরনের সহায়তা না দেওয়ার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রভাব পড়বে কি?
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বাজার। ফলে দেশটিতে অভিবাসন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে নতুন করে কর্মী পাঠানোর পাশাপাশি বর্তমানে সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বৈধতা, কর্মসংস্থানের শর্ত এবং নিয়োগকর্তার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
কারণ বিপুলসংখ্যক কর্মী বৈধ কাগজপত্রের বাইরে চলে গেলে শুধু তাঁদের ব্যক্তিগতভাবে গ্রেপ্তার বা দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি তৈরি হবে না; দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ভাবমূর্তি ও নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সৌদি আরবের সর্বশেষ অভিযান তাই শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগের ঘটনা নয়; বাংলাদেশের মতো শ্রমশক্তি রপ্তানিকারক দেশের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্যও এখন সৌদিতে কর্মরত বাংলাদেশিদের আইনগত অবস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।





