গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ করে কঠোর আইন: সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড
মানবাধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে নতুন আইন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। 'গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬'-এর খসড়ায় গুমের ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান, ভুক্তভোগী ও পরিবারের নিরাপত্তা, তথ্য জানার অধিকার, পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণের আইনি কাঠামো রাখা হয়েছে।
আইনটির খসড়ায় গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের ফলে কারও মৃত্যু হলে, মরদেহ উদ্ধার হলে কিংবা পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: মন্ত্রিসভায় ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’সহ তিন গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের অনুমোদন
গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার ১৫তম বৈঠকে 'গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬'-এর খসড়াটি লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং-সাপেক্ষে নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আইনটির উদ্যোক্তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গুমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির কাঠামো: প্রস্তাবিত আইনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-গুমকে আর সাধারণ নিখোঁজ বা অন্য কোনো অপরাধের সঙ্গে একীভূত না রেখে একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। ফলে গুমের অভিযোগের তদন্ত, বিচার এবং দায় নির্ধারণে একটি পৃথক আইনি কাঠামো কার্যকর হবে। খসড়ায় গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের লক্ষ্যে আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারির বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তি অনুপস্থিত থাকলেও তার বিরুদ্ধে বিচার পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে। ডিজিটাল সাক্ষ্যকে গ্রহণযোগ্য করার পাশাপাশি সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী এবং ভুক্তভোগীর পরিচয় ও নিরাপত্তা সুরক্ষার বিধানও রাখা হয়েছে। আইনটির দর্শন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি গুম হওয়ার পর তার পরিবার যেন বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা ও তথ্যের অন্ধকারে না থাকে, সে জন্য তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার প্রকৃত তথ্য এবং নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘সমকামিতা’ নিয়ে সমালোচনার ঝড়
১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত ও বিচার: গুমের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ঠেকাতে খসড়ায় তদন্ত ও বিচার শেষ করার জন্য সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন এবং পরবর্তী পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন করার বিধান রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এই সময়সীমা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে গুমের অভিযোগে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার অযাচিত বিলম্ব কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে একই সঙ্গে সময়সীমার মধ্যে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সক্ষম তদন্ত এবং বিচারিক ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ক্ষতিপূরণে রাষ্ট্রের দায়:
প্রস্তাবিত আইনে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবারের জন্য সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ জন্য ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠনের বিধানও থাকছে। দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে সেই সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এর ফলে গুমের শিকার পরিবারকে শুধু অপরাধীর বিচারের অপেক্ষায় না রেখে তাদের পুনর্বাসন ও আর্থিক সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের একটি কাঠামো তৈরি হবে।
পরিবারকে সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার: গুম হওয়া
ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতিও থাকছে আইনে। এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি পাঁচ বছর ধরে নিখোঁজ থাকলে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য 'গুম সনদ' দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ফলে নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবারের সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা নিরসনের আইনি পথ তৈরি হবে।
কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: গুমের ঘটনা, ভুক্তভোগী,
তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য সংরক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরির বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি গুমের ঘটনা তদন্ত ও ভুক্তভোগীদের সন্ধানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগও আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইনটির আওতায় সাক্ষী ও অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিধান বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ গুমের মতো গুরুতর অপরাধের তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শী, তথ্যদাতা ও ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা যাতে ভয়, চাপ বা প্রতিশোধের আশঙ্কায় তথ্য গোপন না করেন, সে জন্য নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার নিশ্চয়তা অপরিহার্য।
দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি দানের আইনি সুযোগ: এদিকে পিতা-মাতা বা দাদা-দাদি সন্তান কিংবা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করলেও নিজের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার যাতে বহাল থাকে, সে লক্ষ্যে ঞযব ঞৎধহংভবৎ ড়ভ চৎড়ঢ়বন্ধু (অসবহফসবহঃ) অপঃ, ২০২৬-এর খসড়ায় সংশোধনী আনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। আইন ও বিচার বিভাগ প্রস্তাবিত সংশোধনীটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করে। খসড়াটি লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং-সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান ঞযব ঞৎধহংভবৎ ড়ভ চৎড়ঢ়বহু অপঃ, ১৮৮২-এ দাতা কর্তৃক জীবনকালীন ভোগাধিকার (খরভবঃরসব টংভৎপঃ) সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দানের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকায় এ ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আইনি অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিল। প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে দাতা জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণ করেও সন্তান বা নাতি-নাতনির নামে সম্পত্তি দান করতে পারবেন-এমন একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে সম্পত্তি দানের পর দাতার জীবনকালীন অধিকার নিয়ে বিরোধ ও আইনি জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে ২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাতিল: অন্যদিকে জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ ছাড়াই প্রণীত হওয়ায় 'অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের তালিকা ২০২৬' এবং 'ঔষধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬' বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উদ্যোগে আনা এ প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের তালিকা প্রণয়নের আগে জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু ২০২৬ সালে প্রকাশিত তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি প্রণয়নের সময় সেই বিধান অনুসরণ করা হয়নি।
এ কারণে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির বৈধতা উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন। সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ওই তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিল হবে। তবে ১৯৯৪ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আদেশে প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের তালিকা এবং এসব ঔষধের সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা আপাতত বহাল থাকবে।
পরামর্শ ছাড়া সিদ্ধান্তের আইনগত বৈধতা প্রশ্নে: এখানে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের তাৎপর্য শুধু একটি তালিকা বাতিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আইন যে ক্ষেত্রে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে নির্দিষ্ট পরামর্শ বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা বলে, সেখানে সেই প্রক্রিয়া উপেক্ষা করলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে-২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের তালিকার ঘটনাটি সেই প্রশ্নকেই সামনে এনেছে। ইতোমধ্যে গত ২৯ জুন ২০২৬ ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এর বিধান অনুযায়ী জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রিসভা এ পরিষদে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে।
নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণে জনগণের স্বার্থ: ২০২৬ সালের তালিকা বাতিলের পর অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের তালিকা হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন তালিকা প্রণয়ন এবং ঔষধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে জনগণের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ না পড়া এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। অর্থাৎ, একদিকে আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা ও সাশ্রয়ী মূল্য নিশ্চিত-দুই দিককে সামনে রেখেই নতুন ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
মন্ত্রিসভার ১৫তম বৈঠকের এসব সিদ্ধান্তে একদিকে গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও ভুক্তভোগীর অধিকার নিশ্চিত করার জন্য পৃথক আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ স্পষ্ট হয়েছে; অন্যদিকে সম্পত্তি হস্তান্তর ও ঔষধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান আইনি কাঠামোর ঘাটতি ও প্রক্রিয়াগত বাধ্যবাধকতাকে সংশোধনের
উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আসুন সবাই মিলে দেশটাকে পরিষ্কার ও সুন্দর রাখি: প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আসুন আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করি আমাদের দেশটাকে পরিষ্কার ও সুন্দর রাখতে।
যা নিশ্চিত করবে আমাদের আগামী দিনের বংশধরদের জন্য একটি সুস্থ দেশ, সুস্থ পরিবেশ। গতকাল সোমবার সকালে ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এই আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশের বিষয়টি সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষকে স্পর্শ করে। ৪০ বা ৩০ বছর আগের তুলনায় বর্তমান সময়ে ঢাকা শহরসহ জেলা, উপজেলা ও গ্রামগঞ্জের রাস্তাঘাট এবং বাজার এলাকায় প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, ব্যবহৃত টিস্যুসহ নানাবিধ আবর্জনা যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ময়লা আবর্জনা সঠিক উপায়ে ধ্বংস করার প্রতি গুরত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই পায়ে হেঁটে চলে অথবা বাসে চলাচল করে। এই মানুষগুলো যখন রাস্তা পার হয়, বিভিন্ন জায়গায় যখন আবর্জনা জমে থাকে, ময়লা থাকে, এই মানুষগুলোর কিন্তু অনেক কষ্ট হয়। বিভিন্ন জায়গায় অনেক দুর্গন্ধ হয়, আবর্জনা জমে থাকে। তবে আমরা যদি সবাই মিলে একটু সচেতন হই। যত্রতত্র আমাদের ব্যবহারকৃত আবর্জনা না ফেলে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় জমা করি এবং নির্দিষ্ট উপায়ে যদি এটাকে পরে ধ্বংস করি, তাহলে যেমন আমাদের পরিবেশটি ভালো থাকবে ঠিক একইভাবে আমরা আমাদের পরিবেশটাকে সুন্দরভাবে রাখতে পারব। নিজের ঘরের পরিচ্ছন্নতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, চিন্তা করে দেখুন তো আপনার ঘরে যে ঘরটিতে আপনি থাকেন, যে বাসাটিতে আপনি থাকেন, যদি চারিদিকে এমন তৃষ্ণ ছড়িয়ে থাকতো, যদি চারিদিকে এমন আবর্জনা ছড়িয়ে থাকতো, আপনার কাছে কি ভালো লাগতো দেখতে? নিশ্চয়ই না। আমাদের কারো কাছেই ভালো লাগতো না। কবি তো সুন্দরভাবে লিখেছেন, সবুজ, শস্য শ্যামলা আমার ভুবন। তবে আমরা কেন আমাদের পরিবেশটাকে সুন্দর করতে পারবো না।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার সাম্প্রতিক সফরের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক মাসে যখন আমি দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি হয়তো কোন একটি পুকুরের পাশ দিয়ে যাচ্ছি, দেখেছি পুকুরের ভিতরে বিভিন্ন রকম ময়লা স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। অথবা পুকুরপাড়ে বিভিন্ন ময়লা স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। অথচ একসময় এসব স্থানে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে বসত ও গল্প করত। তিনি বলেন, আমরা যখন যাই তখন হয়তো যারা পরিচ্ছন্ন কর্মী তারা হয়তো পরিষ্কার করে রাখছে। কিন্তু আমরা যখন বেরিয়ে আসছি তখন আর সেটি আগের মতন পরিষ্কার থাকছে না। যদি পরিষ্কার থাকতো আপনি যদি পরিষ্কার করে রেখে আসেন আপনার পরবর্তীতে যে যাবে সেও সেই পরিচ্ছন্নতার সুন্দর পরিবেশটি উপভোগ করতে পারবে। সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, আমরা যদি আজকে থেকে প্রত্যেকে সচেতন হই আমাদের হাতের আবর্জনা বা ব্যবহৃত আবর্জনা যদি নির্দিষ্ট জায়গায় সুন্দরভাবে আমরা গুছিয়ে ফেলি তাহলে ধীরে ধীরে হয়তো আমরা আমাদের এই বাংলাদেশটাকে আবর্জনা মুক্ত করতে পারবো। সুন্দর একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে পারবো। দেশ গঠনে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার উপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশটা তো আমাদের সকলের। আমরা সকলে মিলে যদি চেষ্টা করি তাহলে আমরা বড় কিছু করতে সক্ষম হব। প্রিয় দেশবাসী, আপনাদের কাছে আজকে এই সহযোগিতাটা আমি চাইছি।
অর্থনৈতিক অঞ্চলকে সবুজ শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর: এদিকে, শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে সবুজ, আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) গভর্নিং বোর্ডের সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) জানান, বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি ইপিজেডে বৃক্ষরোপণ করা হবে। এ কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ইপিজেডে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার বৃক্ষ রোপণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান উপ-প্রেস সচিব সুজন মাহমুদ। তিনি বলেন, বৈঠকে বেজার গভর্নিং বোর্ডের নবম সভার সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মূল্যায়ন পর্যালোচনা এবং সরকারি মালিকানাধীন অব্যবহৃত শিল্প-সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় নারায়ণগঞ্জের করিম জুট মিলস ও লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসের জমি ও বিদ্যমান অবকাঠামোকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করা হয়। এসব এলাকায় আধুনিক শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর আবেদন ও লাইসেন্সের ক্ষেত্রে নির্ধারিত গাইডলাইন অনুসরণ ও নতুন নীতিমালা প্রণয়ন নিয়েও আলোচনা হয় বলে জানান সুজন মাহমুদ। সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন উপস্থিত ছিলেন।
গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনে সৌর প্যানেল বসানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর: অন্যদিকে, দেশে চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ত্বরান্বিত করতে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনে পর্যায়ক্রমে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সৌর বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত এক সভায় এ নির্দেশ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু এ কথা জানান। তিনি জানান, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে তারেক রহমান মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলোতে পর্যায়ক্রমে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি দেশে সোলার ইনভার্টার উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়া সাধারণ মানুষের জন্য সৌর বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও লাভজনক করে তুলতে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক মডেল প্রণয়নের নির্দেশও দেন প্রধানমন্ত্রী। উপ প্রেস সচিব আরও জানান, সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ে বঙ্গভবন, তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জাতীয় সংসদ ভবন, বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভবন, পরিকল্পনা কমিশন ভবনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনে পর্যায়ক্রমে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হবে। সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি ভবনে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহ বাড়বে। এ কারণেই তিনি বিভিন্ন সরকারি ভবনে সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা দেন।
এ সময় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ও ওয়ালটন গ্রুপ পৃথক উপস্থাপনায় আবাসিক ভবনে সৌর প্যানেল স্থাপন এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। তাদের উপস্থাপনায় বলা হয়, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয়ের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। সভায় আরও বলা হয়, ভোক্তাদের মধ্যে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারে আগ্রহ বাড়াতে এর অর্থনৈতিক ও ব্যবহারিক সুবিধাগুলো ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে হবে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে এয়ার কন্ডিশনার, ফ্যান, লিফটসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানো সম্ভব বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয় বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু। সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী এবং গ্রুপের সোলার ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ বিভাগের এজিএম তওহিদুল আহাদ, ওয়ালটন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম মাহবুবুল আলমসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।





