হাসিনা কাউকে বিশ্বাস করতেন না, এনটিএমসির মাধ্যমে ফোনকল নজরদারি করতেন: প্রসিকিউশন

Sadek Ali
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৯:৩৩ অপরাহ্ন, ০৯ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৯:৩৩ অপরাহ্ন, ০৯ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের বা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও পদধারীদের কাউকে বিশ্বাস করতেন না বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। এ কারণে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মাধ্যমে সবার ফোনকল রেকর্ড করাতেন এবং কে কী বলছেন, তা নিজেই মনিটরিং ও নজরদারি করতেন বলে দাবি প্রসিকিউশনের।

প্রসিকিউশন জানিয়েছে, শেখ হাসিনা এনটিএমসির প্রধান হিসেবে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তার মাধ্যমে ফোনকলগুলো রেকর্ড করা হতো।

আরও পড়ুন: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান: ঢাকা-গোপালগঞ্জ রুটে চালু হচ্ছে নতুন ট্রেন

রোববার (৯ আগস্ট) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ একটি মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় এসব বিষয় তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ সাত নেতার বিরুদ্ধে তৃতীয় দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেছে প্রসিকিউশন।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী ফখরুল, ১১ দলের অলি

যুক্তিতর্কে জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে কোথায় কী ধরনের বৈঠক ও যোগাযোগ হয়েছিল, সেসবের বিভিন্ন দিক ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন গাজী এমএইচ তামিম। এ সময় ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশের পৃথক দুটি ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে বাজিয়ে শোনানো হয়। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের বেশ কয়েকটি কথোপকথনের উদ্ধৃতিও তুলে ধরেন প্রসিকিউটর।

সাংবাদিকদের গাজী এমএইচ তামিম বলেন, ট্রাইব্যুনালে ১৪টি কথোপকথন উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে শুরুতেই ওবায়দুল কাদের ও জুনাইদ আহমেদ পলকের একটি কথোপকথন শোনানো হয়, যা ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালে দালিলিক প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। ওই কথোপকথন থেকে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ইন্টারনেট সেবা সীমিত করার নির্দেশ ও পরে শেখ হাসিনার অনুমোদন নিয়ে তা কার্যকরের বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।

প্রসিকিউটর বলেন, বিষয়টি শুধু কথোপকথনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৬ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা থেকে দেশের ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে থ্রি-জি ও ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। আন্দোলনের সময় ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটকসহ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষায়, এটি ‘সিস্টেম ক্রাইম’-এর একটি অংশ। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়া আহত আন্দোলনকারীদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গাজী এমএইচ তামিম আরও বলেন, ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে চট্টগ্রামের তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের কথোপকথনের পরপরই ১৬ জুলাই ওয়াসিমসহ তিনজনকে আওয়ামী লীগের নেতারা গুলি করে হত্যা করেন। একইভাবে ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে ট্যাগ দেওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি।

প্রসিকিউটরের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী, জঙ্গি, বিএনপি-জামায়াত ও ‘রিলিজিয়াস অ্যাক্টিভিস্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি উঠে আসে। হাছান মাহমুদ ‘জঙ্গি’ শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থন পাওয়ার বিষয়েও কথা বলেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।

এ সময় শেখ হাসিনার একটি কথোপকথনের উদ্ধৃতিও ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন প্রসিকিউটর। এতে আন্দোলনকারীদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তামিম জানান, উপস্থাপিত ১৪টি কথোপকথনই সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে।

এনটিএমসি প্রসঙ্গে প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনার সময়ে চালু করা বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারও ছিল। এর প্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান। তার মাধ্যমে ফোনকল রেকর্ড করা হতো বলে দাবি করেন তিনি।

প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনা নিজে যার সঙ্গে কথা বলতেন, তার ফোন নম্বর এনটিএমসিতে থাকত। ফলে ওই ব্যক্তির সঙ্গে অন্য কেউ কথা বললেও তা রেকর্ড হয়ে যেত। একইভাবে শেখ হাসিনা ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বললে তার ফোনকলও রেকর্ড হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তামিম আরও বলেন, বিভিন্ন কল রেকর্ড থেকে দেখা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মী তাদের অধীনস্থদের প্রাণঘাতী অস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। এছাড়া ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দলের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের কথোপকথনে টাকা দিয়ে সারাদেশে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আন্দোলন প্রতিহত করা এবং আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল বলেও দাবি করেন প্রসিকিউটর। ওই টাকা কোন উৎস থেকে আসবে এবং কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, সে বিষয়েও একটি কথোপকথন উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।