৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ
#২০ আগস্ট সংসদ ভবনে ভোট ২টা থেকে ৫টা
#৩৪৯ এমপি ভোটার
আরও পড়ুন: নবনিযুক্ত নৌবাহিনী প্রধানের সঙ্গে আনসার-ভিডিপি মহাপরিচালকের সৌজন্য সাক্ষাৎ
#অধিবেশন কক্ষেই ব্যালট গণনা ও প্রাথমিক ফল ঘোষণা
দীর্ঘ ৩৫ বছর ১০ মাস পর আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য ভোট দেবেন। ভোটগ্রহণ শেষে একই কক্ষে ব্যালট গণনা করে প্রাথমিক ফল ঘোষণা করা হবে। পরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে প্রকাশ করা হবে চূড়ান্ত ফলাফলের সরকারি গেজেট।
আরও পড়ুন: বন্ধ তিন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল চালু করতে চুক্তি সই, বিনিয়োগ হবে ৬১৯ কোটি টাকা
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি ও ভোটগ্রহণের বিস্তারিত প্রক্রিয়া তুলে ধরেন নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
এর আগে ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর অনুষ্ঠিত ওই পরোক্ষ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে পরাজিত করেন। বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। ৩৩০ সদস্যের সংসদে ৬৬ জন ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি জনগণের সরাসরি ভোটে নয়, সংসদ সদস্যদের ভোটে অনুষ্ঠিত হয়।
২০ আগস্ট সংসদ ভবনে ভোট
ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে মঙ্গলবার সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে একটি প্রস্তুতিমূলক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে স্পিকার, সরকারদলীয় চিফ হুইপ, বিরোধী দলের চিফ হুইপ, সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সেখানে ভোটগ্রহণের স্থান, সময়, ব্যালট বিতরণ, ভোটগ্রহণ, গণনা ও ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়।
তিনি বলেন, ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ হবে। এ সময় সংসদ সদস্যরা তাঁদের নির্ধারিত আসনে অবস্থান করবেন। নির্বাচন কমিশনের সহায়ক কর্মকর্তারা তাঁদের কাছে ব্যালট পেপার পৌঁছে দেবেন।
ভোটগ্রহণের সময় তিনটি ব্যালট বাক্স রাখা হবে। সংসদ সদস্যরা তাদের সুবিধাজনক যেকোনো একটি বাক্সে ভোটপত্র জমা দিতে পারবেন।
সিনিয়র সচিব জানান, কোনো অনিবার্য কারণে কোনো সংসদ সদস্য ভোট দিতে কিছুটা দেরিতে পৌঁছালে যাতে তাঁর ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকে, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণের সময় রাখা হয়েছে।
অধিবেশন কক্ষেই গণনা
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিবেশন কক্ষেই ব্যালট গণনা করা হবে। গণনার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মী নিয়োজিত থাকবেন। তবে গণনায় ঠিক কতজন কর্মকর্তা থাকবেন, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান ইসি সচিব।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ভোটার ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। ভোটগ্রহণ শেষে কতটি ব্যালট পড়েছে, কতটি বৈধ হয়েছে এবং প্রার্থীরা কত ভোট পেয়েছেন—গণনার মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা হবে।
গণনা শেষে সংসদ ভবনেই প্রাথমিক ফল ঘোষণা করা হবে। তবে চূড়ান্ত ফলাফলের সরকারি গেজেট নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে প্রকাশ করা হবে।
ব্যালটে থাকবে প্রার্থীদের নাম
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালট পেপার প্রস্তুত ও ছাপানোর কাজও এগিয়ে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। ইসি সচিব জানান, ব্যালট পেপারের দুটি অংশ থাকবে। একটি অংশে থাকবে ব্যালটের ক্রমিক নম্বর, ভোটদাতার নাম, বিভক্তি নম্বর এবং ভোটদাতার স্বাক্ষরের জন্য নির্ধারিত স্থান।
অন্য অংশে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম থাকবে। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত স্থানে ভোটদাতা তাঁর পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভোট দেবেন।
ব্যালট পেপার নির্ধারিত নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ছাপানো হবে জানিয়ে সিনিয়র সচিব বলেন, এতে প্রার্থীদের নাম মুদ্রণের ক্ষেত্রে ভুলের সুযোগ থাকবে না।
২০ কর্মকর্তা দেবে ইসি
ভোটগ্রহণের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে ২০ জন সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম সংসদ সচিবালয়ে পাঠানো হবে। তাঁদের জন্য পৃথক পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি সংসদ সচিবালয় থেকেও প্রয়োজনীয়সংখ্যক সহায়ক কর্মকর্তা দেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশনের কোনো কমিশনার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রত্যক্ষ করতে চাইলে তাঁদের নামও সংসদ সচিবালয়ে পাঠানো হবে বলে জানান আখতার আহমেদ। তাঁরা সেখানে উপস্থিত থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
সংবাদকর্মীদের জন্য নির্ধারিত স্থান
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ, ব্যালট গণনা ও প্রাথমিক ফল ঘোষণার প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করতে সংবাদকর্মীদের জন্য সংসদ ভবনে নির্ধারিত স্থান রাখার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
ইসি সচিব বলেন, সংবাদকর্মীরা যাতে তাঁদের নির্ধারিত জায়গায় বসে পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, সে ব্যবস্থা থাকবে। সেখান থেকে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থাও রাখা হবে।
সংসদ সদস্যরা তাঁদের নির্ধারিত আসনে বসবেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বসার স্থান সংসদ সচিবালয় নির্ধারণ করবে বলেও জানান তিনি।
১৯৯১-এর পর আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চ
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ইতিহাসে ১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর প্রথম পরোক্ষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন এবং বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
এরপর সংসদীয় ব্যবস্থায় আর কোনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি। ফলে ২০২৬ সালের নির্বাচনটি শুধু সাংবিধানিক পদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; দীর্ঘ বিরতির পর সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে যাচ্ছে।
সংসদে প্রাথমিক ফল, ইসিতে গেজেট
আখতার আহমেদ বলেন, ভোট গণনা শেষ হওয়ার পর সংসদ ভবনেই প্রাথমিক ফল ঘোষণা করা হবে। নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্মকর্তা হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সেখানে প্রাথমিক ফল ঘোষণা করবেন। এরপর নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে চূড়ান্ত ফলাফলের সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ইসি সচিব বলেন, ফলাফলের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা রাজনৈতিক নেতারাই দেবেন। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো আইন ও নির্ধারিত বিধিবিধান অনুসরণ করে নির্বাচন সম্পন্ন করা।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে ভোটগ্রহণের স্থান ও সময় নির্ধারণ, ব্যালট পেপার প্রস্তুত ও মুদ্রণ, সহায়ক কর্মকর্তা নিয়োগ, ব্যালট বাক্স স্থাপন, ভোট গণনা এবং ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়া নির্ধারণসহ সার্বিক প্রস্তুতি এগিয়ে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।





