গুমের শিকার ব্যক্তিদের সরাসরি ন্যায়বিচারের পথ সুগম করেছে প্রস্তাবিত আইন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১০:১৪ অপরাহ্ন, ২৯ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১০:৩৭ অপরাহ্ন, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ গুমের শিকার ব্যক্তিদের সরাসরি আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও প্রতিকার পাওয়ার পথ সুগম করেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে না ফেলে সরাসরি আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে।

আরও পড়ুন: রাজধানীর যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর একগুচ্ছ যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত

শুক্রবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে মানবাধিকার সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত ‘To Make the Disappeared Appear: Law, Justice, Accountability and Human Rights’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা ও বিশেষ চিত্র প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ২৭ আগস্ট আইনটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। এতে গুমের শ্রেণিবিভাগ ও অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন থেকে ক্ষেত্রবিশেষে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন: আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ, গুমের বিচার ও জবাবদিহির আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

এ ছাড়া কোনো গুমের শিকার ব্যক্তি দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকলে পাঁচ বছর পর আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে তাঁর ওয়ারিশদের সম্পত্তির অধিকার পাওয়ার সুযোগ এবং দায়ী পক্ষ ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইনটি বর্তমানে সংসদীয় কমিটিতে রয়েছে। এতে আরও ভালো কোনো পরামর্শ থাকলে তা অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও জাতীয় চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখের কথিত গুমের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকায় যৌথ বাহিনীর ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ’ ও ‘অপারেশন সুন্দরবন’-এর কারণে জলদস্যু ও বনদস্যুরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এ কারণে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে কোস্টগার্ডের কার্যালয়ে হামলা চালানোর ঘটনায় একটি কোস্টগার্ডকেন্দ্রিক মামলা হয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে মিরাজ শেখের ঘটনায় দস্যু দলগুলোর নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের তথ্য রয়েছে বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, নিরপেক্ষ তদন্তেও কোনো সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, ঘটনাটি নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সরকার প্রয়োজনে যেকোনো নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনে প্রস্তুত রয়েছে।

বর্তমান সরকারের গত ছয় মাসের মেয়াদে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অগ্রগতি তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ সময়ে কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা গুমের ঘটনা ঘটেনি।

তিনি বলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নড়বড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধি ও ইতিবাচক উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি ‘পুরস্কার ও শাস্তি’ (Reward and Punishment) নীতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতানির্ভর নতুন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামে একটি এলিট ফোর্স গঠনের আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে।

অনুষ্ঠানে নিজের গুম হওয়ার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে ৫ বাই ১০ ফুটের একটি প্রকোষ্ঠে কোনো ভেন্টিলেশন ছাড়াই তাঁকে দীর্ঘদিন বন্দি রাখা হয় এবং মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়।

বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। পরে চোখ বেঁধে তাঁকে ভারতের শিলংয়ে পাচার করে দেওয়া হয় বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তাঁর ভাষ্য, বৈধ কাগজপত্র না থাকায় আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘনের মামলায় তাঁকে দীর্ঘ সাড়ে নয় বছর আইনি লড়াই করতে হয়েছে। পরে ভারতীয় আদালত তাঁকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেন।

ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়ায় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও বীর ছাত্রদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

সংসদ সদস্য ও ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলির সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী, সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান), সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মানবাধিকার কর্মী ও বলপূর্বক অন্তর্ধান সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন, আলোকচিত্র শিল্পী শহীদুল আলম এবং নেত্র নিউজের এক্সিকিউটিভ এডিটর নাজমুল আহসানসহ অনেকে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ফ্যাসিবাদী আমলে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

এর আগে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে গুম ও নির্যাতনের ওপর আয়োজিত সাত দিনব্যাপী বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ২৯ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চলবে এ প্রদর্শনী। পরে তিনি প্রদর্শনীটি ঘুরে দেখেন।