রামপালের সৌরবিদ্যুৎ জ্বালানিতে আশার আলো

Sanchoy Biswas
শামসুজ্জামান শামস
প্রকাশিত: ১০:৫৯ অপরাহ্ন, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৪:২০ পূর্বাহ্ন, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৫০২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা
  • সৌরবিদ্যুতের সাথে ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা যুক্ত থাকবে
  • ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ
  • প্রকল্পের প্রস্তাবিত বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ছয় টাকা ১৮ পয়সা
  • রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় সৌরবিদ্যুতের প্রস্তাবিত দাম ইউনিট-প্রতি সাত টাকা ৩৯ পয়সা কম

একবিংশ শতাব্দীর এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি’ বিশ্বব্যাপী এক অপরিহার্য উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক রূপান্তরের বাইরে নয়। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর অংশ হিসেবে বাগেরহাটের রামপালে দেশের সর্ববৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) রামপাল প্রকল্প এলাকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাতিল হওয়া দ্বিতীয় ইউনিটের জমিতে এই বিশাল গ্রিন এনার্জি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) কর্তৃক অনুমোদিত এই প্রকল্প কেবল দেশের পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতাই বাড়াবে না, বরং পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। বাগেরহাটের রামপালে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমসহ (বিইএসএস) ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এটি দেশের অন্যতম বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হবে। ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, এতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৫০২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে  দুই হাজার ১২৭ কোটি টাকা পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট ফান্ড থেকে এবং ৩৭৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বিপিডিবির নিজস্ব অর্থায়ন থেকে দেয়া হবে। প্রকল্পটির অন্যতম আকর্ষণ হলো, সৌরবিদ্যুতের সাথে ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা যুক্ত থাকবে। দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করে প্রয়োজনের সময়ে ব্যবহার করা যাবে। ফলে সূর্যের আলো না থাকা কিংবা উৎপাদন কমে যাওয়ার সময় সৌরবিদ্যুতের সরবরাহ কিছুটা স্থিতিশীল রাখার সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্পের প্রস্তাবিত বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ছয় টাকা ১৮ পয়সা। রামপালে দেশের সর্ববৃহৎ ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সবুজ শক্তি খাতে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ সবুজ উৎস থেকে উৎপাদনের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই মেগা প্রকল্প চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে, যা দেশকে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির মহাসড়কে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।বিএনপি সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। এ খাতকে নানা সুবিধা দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বর্তমান নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আগামী গ্রীষ্মের আগে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেই ছাদবিদ্যুতে জোর দেওয়া হয়েছে। এতে অন্তত গত গ্রীষ্মের মতো ভোগান্তি হবে না। ছাদের পাশাপাশি সরকারি জমিতে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ আছে। ইতিমধ্যে বাগেরহাটের রামপালে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নির্ধারিত জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন করেছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে বর্তমান সরকার। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব নয়। ইতিমধ্যে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ১ শতাংশের নামিয়ে আনা হয়েছে। ছাদবিদ্যুতের ব্যাপক প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। প্রতি ইউনিট ছাদবিদ্যুৎ সাড়ে ১০ টাকায় কিনে নেবে সরকার। এতে করে বাজারে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ছাদের পাশাপাশি এখন জমিতেও বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের গতি বাড়াতে হবে। সরকারিভাবে জমি বরাদ্দ দিয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়েও সস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে ১০ থেকে ১২ বছর সময় লাগতে পারে। সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র করা যায় দেড় বছরের মধ্যে। এ ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণ একটি বড় সমস্যা। তবে দেশে প্রায় ৩৬ লাখ একর খাসজমি আছে, অকৃষিজমি আছে ১৮ লাখ একর। এসব জমির মধ্যে চরের ৩০ হাজার একর জমি ব্যবহার করে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ আছে। পিডিবির প্রায় ৬ হাজার একর জমি আছে, এখানেও সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র করা যায়। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও কমে আসছে। ৫০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতে সাড়ে তিন কোটি ডলার বা ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। ৬ থেকে ৭ বছরের মধ্যে বিনিয়োগ উঠে আসে। নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ছাদ থেকে শুরু করে ছোট আকারের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সরকারের ইতিবাচক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। বেসরকারি খাতেও শিল্পের ছাদে কেউ কেউ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। তবে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে গতি বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যেসব কেন্দ্র বাতিল করেছে, সেগুলো মূল্যায়নে সরকার গঠিত কমিটির দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে বিদ্যুতের দাম নিয়ে সমঝোতা করে যথাযথ বিদেশি কোম্পানিকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।

আরও পড়ুন: ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চট্টগ্রাম বন্দর নিউমুরিং টার্মিনালের চুক্তি সই

বিপিডিবি ২০১২ সালে রামপালে মোট এক হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে। জমিটি এ ও বি- দুই ব্লকে বিভক্ত। ব্লক-এতে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানি লিমিটেডের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। ব্লক-বি বিপিডিবির অধীনে। ব্লøক বি’র মোট ৯১৮ দশমিক ৫০ একর জমির একটি অংশ গ্রিনবেল্ট, বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ ও লেকের জন্য নির্ধারিত। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় এ ব্লকের ৬৮৫ একর জমি ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য উপযুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ভূমি উন্নয়ন ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজের বড় অংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ফলে নতুন করে বড় ধরনের ভূমি উন্নয়ন ব্যয় প্রয়োজন হবে না। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় তুলনামূলক কম রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিপিডিবির হিসাবে, প্রতি মেগাওয়াট স্থাপনে প্রকল্প ব্যয় প্রায় পাঁচ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। প্রাথমিকভাবে রামপালের এ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল। তবে ২০১০ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে নেয়া কার্যক্রম এবং পরবর্তী সময়ে আইনটি বাতিল হওয়ায় ওই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।

পরবর্তী সময়ে অবকাঠামো বিনিয়োগ সহায়তা কোম্পানি (আইআইএফসি) ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করে। সমীক্ষায় ৬৮৫ একর জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াটের গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশও করা হয়েছে, যাতে বিদ্যুতের দাম প্রতিযোগিতামূলক রাখা যায়। প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে শূন্য দশমিক ৮ কিলো ভোল্ট থেকে ৩৩ কিলো ভোল্ট এবং পরে ২৩০ কিলো ভোল্টে উন্নীত করা হবে। এরপর বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানির ৪০০/২৩০ কিলো ভোল্ট সাবস্টেশনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। এ জন্য একটি নতুন সাবস্টেশন এবং প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ২৩০ কিলো ভোল্ট সঞ্চালন লাইন নির্মাণের প্রয়োজন হবে।

আরও পড়ুন: গিয়াস উদ্দিন রিমন সচিব পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী নিযুক্ত

রামপাল প্রকল্পের অর্থনৈতিক দিকের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এর প্রস্তাবিত বিদ্যুতের দাম ফেনীর সোনাগাজীর ২২০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

সোনাগাজী প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় এক হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা এবং ইউনিট-প্রতি বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে আট টাকা ৮৭ পয়সা। বিপরীতে রামপাল প্রকল্পে প্রস্তাবিত দাম ছয় টাকা ১৮ পয়সা। অর্থাৎ সোনাগাজীর তুলনায় রামপালের প্রস্তাবিত ইউনিট-প্রতি দাম দুই টাকা ৬৯ পয়সা কম। শতাংশের হিসাবে সোনাগাজীর দাম রামপালের চেয়ে প্রায় ৪৩ শতাংশ বেশি। তবে সক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র রয়েছে। সোনাগাজীর ক্যাপাসিটি ইউটিলাইজেশন ফ্যাক্টর ধরা হয়েছে ২১ শতাংশ, যেখানে রামপালের ক্ষেত্রে ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ কম ইউনিট-প্রতি দামের পাশাপাশি রামপাল প্রকল্পে প্রত্যাশিত উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার তুলনামূলক কম।

সোনাগাজীতে প্রতি মেগাওয়াট স্থাপনে ব্যয় প্রায় ছয় কোটি ২৭ লাখ টাকা। রামপালে এ ব্যয় প্রায় পাঁচ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। রামপাল সৌর প্রকল্পের অর্থনৈতিক আকর্ষণ আরো স্পষ্ট হয় বিদ্যুতের সাম্প্রতিক দাম তুলনা করলে। নতুন ৪৪২ মেগাওয়াট রামপাল সৌর প্রকল্পের প্রস্তাবিত দাম ছয় টাকা ১৮ পয়সা ইউনিট-প্রতি। বিপরীতে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বর্তমান রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্ধারিত/রিভিউ করা দাম প্রায় ১৩ টাকা ৫৭ পয়সা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আদানি পাওয়ার থেকে বাংলাদেশ যে বিদ্যুৎ কিনেছে, তার গড় প্রকৃত ক্রয়মূল্য ছিল ১৪ টাকা ৮৬ পয়সা ইউনিট-প্রতি।

রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় সৌরবিদ্যুতের প্রস্তাবিত দাম ইউনিট-প্রতি সাত টাকা ৩৯ পয়সা কম, অর্থাৎ প্রায় ৫৪.৫ শতাংশ কম। আদানির বিদ্যুতের তুলনায় পার্থক্য আরো বেশি- ইউনিট-প্রতি আট টাকা ৬৮ পয়সা, অর্থাৎ প্রায় ৫৮.৪ শতাংশ কম। অন্যভাবে বললে, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের দাম সৌর প্রকল্পের প্রায় ২.২০ গুণ, আর আদানির বিদ্যুতের দাম প্রায় ২.৪০ গুণ। এই পার্থক্যের আর্থিক প্রভাব আরো স্পষ্ট হয় সম্ভাব্য বার্ষিক উৎপাদনের হিসাবে। রামপাল সৌর প্রকল্পে সক্ষমতা ব্যবহারের হার ১৭ শতাংশ ধরা হয়েছে। ৪৪২ মেগাওয়াট স্থাপিত ক্ষমতার ভিত্তিতে এতে বছরে সম্ভাব্য উৎপাদন দাঁড়ায় প্রায় ৬৫.৯৩ কোটি ইউনিট।

প্রস্তাবিত ছয় টাকা ১৮ পয়সা ইউনিট-প্রতি দরে এ পরিমাণ বিদ্যুৎ কিনতে ব্যয় হবে প্রায় ৪০৭ কোটি টাকা। একই পরিমাণ বিদ্যুৎ রামপাল কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের ১৩ টাকা ৫৭ পয়সা ইউনিট-প্রতি দরে কিনলে ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৮৯৫ কোটি টাকা। ফলে একই পরিমাণ বিদ্যুতের ক্ষেত্রে রামপাল সৌর প্রকল্পের তুলনায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতে বছরে প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকা বেশি ব্যয় হতে পারে।

আদানির ১৪ টাকা ৮৬ পয়সা ইউনিটপ্রতি গড় ক্রয়মূল্য ধরে একই পরিমাণ ৬৫.৯৩ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে ব্যয় হতো প্রায় ৯৭৯ কোটি টাকা। সে ক্ষেত্রে রামপাল সৌরের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরকেন্দ্রটি প্রাক্কলিত ১৭ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহারের হারে উৎপাদন করতে পারলে একই পরিমাণ বিদ্যুতের তুলনায়- রামপাল কয়লার ক্ষেত্রে বছরে প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকা, আদানির ক্ষেত্রে বছরে প্রায় ৫৭২ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটিকে সরাসরি নিশ্চিত নগদ সাশ্রয় হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ ছয় টাকা ১৮ পয়সা হলো প্রকল্পের প্রস্তাবিত ট্যারিফ। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর প্রকৃত উৎপাদন, ব্যাটারি ব্যবহারের হার, ব্যাটারির অবক্ষয়, প্রতিস্থাপন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং সঞ্চালন ব্যয়ের ওপর প্রকৃত অর্থনৈতিক ফল নির্ভর করবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভর কয়লা, এলএনজি ও জ্বালানি তেলের ওপর চাপ কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। সৌরবিদ্যুৎ এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম জ্বালানি ঝুঁকির একটি উৎস। বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব নূর আহমেদ বলেন, রামপালের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি সময়োপযোগী এবং দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করবে। তার মতে, সোনাগাজীর ২২০ মেগাওয়াট প্রকল্পের তুলনায় রামপাল প্রকল্পের আকার প্রায় দ্বিগুণ। একই সাথে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রস্তাবিত মূল্য এবং প্রতি মেগাওয়াট স্থাপনের ব্যয় কম হওয়ায় প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলক কার্যকর হতে পারে।