এনসিপির জাতীয় কনভেনশন
মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ও ‘গ্রেপ্তার–জামিন হয়রানি’ বন্ধে আইনি সংস্কারের দাবি
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষায় বিদ্যমান আইনি কাঠামোর ঘাটতি দূর করে অবিলম্বে সংস্কার আনার দাবি জানিয়েছেন আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সরকারের সমালোচনার কারণে গ্রেপ্তার, জামিনে প্রতিবন্ধকতা এবং দীর্ঘ বিচারিক হয়রানি—এসব প্রবণতা আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং তা দ্রুত বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা হলে রোববার (৩ মে) জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজনে ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনের তৃতীয় সেশনে এসব বক্তব্য উঠে আসে। ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার: বর্তমান ঝুঁকি ও করণীয়’ বিষয়ক এ সেশনে দেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি, বিচারিক প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়।
আরও পড়ুন: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে ‘ভণ্ডামি’, হাসনাত আবদুল্লাহর সমালোচনা
সেশনে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ এবং সঞ্চালনা করেন দলের যুগ্ম সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আলামিন। আলোচনায় অংশ নেন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সারা হোসেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, গবেষক, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীরা।
সভাপতির বক্তব্যে আসিফ মাহমুদ বলেন, একটি কার্যকর গণতন্ত্রে স্বাধীন গণমাধ্যম অপরিহার্য হলেও বাস্তবে এর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা বাড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, গণমাধ্যমের মালিকানা ও অবস্থানের পরিবর্তনের কারণে জনআস্থা কমে যাচ্ছে এবং মানুষ বিকল্প মাধ্যমের দিকে ঝুঁকছে। “মানবাধিকার বাস্তবায়নে সুসংহত আইনি কাঠামোর অভাব পুরোনো দমনমূলক চর্চাকে টিকিয়ে রেখেছে,”—বলেন তিনি।
আরও পড়ুন: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠবে সরকার
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, মানবাধিকার সর্বজনীন ও অবিভাজ্য; এটি কোনো দল বা মতের ভিত্তিতে প্রয়োগ করা যায় না। তিনি বর্তমান বিচারিক বাস্তবতায় জামিনপ্রাপ্তির জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “তদন্ত শেষ না করেই দীর্ঘ সময় আটক রাখা ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং এতে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন হয়।”
ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, মতপ্রকাশের কারণে গ্রেপ্তার কেবল তাৎক্ষণিক শাস্তি নয়, বরং পরবর্তী দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়াই অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত হয়রানিতে পরিণত হয়। “মামলার ধারাবাহিক হাজিরা, আর্থিক ব্যয় ও সামাজিক চাপ একজন নাগরিককে চরম ভোগান্তিতে ফেলে,”—উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, এই প্রবণতা নাগরিকদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে স্বাধীন মতপ্রকাশকে নিরুৎসাহিত করছে।
সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, অতীতে সংঘটিত গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর কার্যকর ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। “দায়মুক্তির সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকি বাড়বে,”—মন্তব্য করেন তিনি।
মানবাধিকারকর্মী মিনহাজ আমান ভুয়া তথ্য বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণার বিষয়ে বলেন, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হতে পারে। তবে আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি। “পক্ষপাতমূলক প্রয়োগ আইনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং জনগণের আস্থা নষ্ট করে,”—বলেন তিনি।
যুবনেতা তরিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, মতপ্রকাশের কারণে এখনো বিভিন্ন আইনি ধারা ব্যবহার করে নাগরিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিচারিক সিদ্ধান্তে চাপ বা ভীতির প্রভাব দেখা যাচ্ছে। “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে,”—উল্লেখ করেন তিনি।
বক্তারা সম্মিলিতভাবে মত দেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা, নির্বিচার গ্রেপ্তার বন্ধ, জামিনপ্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে মানবাধিকারসম্মত, আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক আইনি কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।





