নানান সংকটের মধ্যেও মৎস্য খাতে বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় সাফল্য

Sadek Ali
শামসুজ্জামান শামস
প্রকাশিত: ১১:৫৩ পূর্বাহ্ন, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১:১১ অপরাহ্ন, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

#  মৎস্য আহরণে বিশ্বে ২য় বাংলাদেশ, সম্ভাবনা কাজে লাগানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

# মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে : মৎস্যমন্ত্রী

আরও পড়ুন: চিকিৎসকদের বদলি-পদায়নে অটোমেশনে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়

# ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাছের বার্ষিক চাহিদা ছিল ৩৮.০৯ লাখ মেট্রিক টন

#  একই সময়ে দেশে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫১.১১ লাখ মেট্রিক টন

আরও পড়ুন: হঠাৎ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা

# বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ মৎস্যচাষী দেশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে

বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবেই নদীমাতৃক দেশ। মানুষের নিরাপদ আমিষ ও পুষ্টি সরবরাহ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে মৎস্য খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের মৎস্য খাত এক অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে, যা বিশ্ব দরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ মৎস্যচাষী দেশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ের মৎস্য আহরণে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশের অবস্থানও ধরে রেখেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এফএও’র প্রতিবেদন ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’-এ  বলা হয়, ২০২৪ সালে বিশ্বে মৎস্য ও মৎস্যচাষ খাতে মোট উৎপাদন রেকর্ড ২৩ কোটি ৫০ লাখ টনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে জলজ প্রাণীর উৎপাদন ছিল ১৯ কোটি ৫০ লাখ টন এবং শৈবালের উৎপাদন ৪ কোটি টন। ২০২২ সালের তুলনায় মোট উৎপাদন বেড়েছে ৫.২%। এ উৎপাদনের প্রাথমিক বিক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে মাছ উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে চীন। দেশটি বৈশ্বিক উৎপাদনের ৫৬% জোগান দিয়েছে। এরপর রয়েছে ভারত ১২%, ইন্দোনেশিয়া ৬%, ভিয়েতনাম ৫% এবং বাংলাদেশ ৩%। এই পাঁচ দেশ মিলে মোট উৎপাদনের ৮২% সরবরাহ করেছে। বাংলাদেশ বদ্ধ জলাশয়ে চাষ করা মাছ উৎপাদনে ৫ম এবং ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে ১ম স্থানে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, পানির গুণগত মান হ্রাস এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির মতো নানামুখী প্রতিকূলতা জয় করে বাংলাদেশ আজ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিগত কয়েক দশকে সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক চাষ পদ্ধতি এবং বিজ্ঞানসম্মত ইলিশ ব্যবস্থাপনার ফলে এ খাতে একটি নীরব বিপ্লব ঘটেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ ও জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির মধ্যেও সরকার সময়োপযোগী পদক্ষেপ ও বাস্তবসম্মত নীতিমালার মাধ্যমে মাছের উৎপাদন ও সুরক্ষায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। 

বিশ্বে অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। অর্থাৎ বিশ্বের সব রকমের পরিসংখ্যানেই দেখা যায় মৎস্য চাষ কিংবা মৎস্য আহরণে বিশ্বে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বর্তমানে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনা থাকার ফলে আমরা যদি পরিকল্পিতভাবে পরিশ্রম করি, এখান থেকে বহু মানুষের কর্মসংস্থান যেমন হবে, একই সাথে আমরা আরও অনেক বেশি পরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হব, ইনশাআল্লাহ। ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর উদ্বোধন ও পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা যারা মৎস্য উৎপাদন এবং বিতরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, নিঃসন্দেহে আপনারা জানেন, মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে খুলনা অঞ্চলে ৩০০টি ক্লাস্টার গঠন করে ক্লাস্টারভিত্তিক চিংড়ি চাষ উন্নয়নের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৭,৫০০ ঘেরে উৎপাদন গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি বলেন, পাশাপাশি কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলায় ৭,০০০ একর জমিতে চিংড়ি চাষ উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো উন্নয়নসহ শ্রিম্প সিটি মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে এর ভিতরে।”

শুধু চিংড়িই নয়, বাংলাদেশের ঐতিহ্য ইলিশ মাছ উৎপাদন এবং সংরক্ষণের ব্যাপারেও সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ইলিশ শুধু জাতীয় মাছ কিংবা একটি অর্থনৈতিক সম্পত্তি নয়, এটি বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবেও বিশ্বে স্বীকৃত।” দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ, যা দেশজ জিডিপির ১ শতাংশেরও বেশি। ২০০৩-৪ সালে বিএনপি সরকারের সময় ইলিশা ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছিল, যার ফলে পরবর্তীতে ইলিশ মাছের উৎপাদন সমগ্র বাংলাদেশে অনেক বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মৎস্য খাত শুধু আমিষ ও পুষ্টির জোগান নয়, বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। দেশের নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর, হাওর-বাঁওড়সহ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের পরিমাণ প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ লাখ হেক্টর এবং বদ্ধ জলাশয় রয়েছে ৮ দশমিক ৫ লাখ হেক্টর। এছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিস্তৃত ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক জলসীমা আমাদের মৎস্যসম্পদের অন্যতম প্রধান ভাণ্ডার। মৎস্যসম্পদের সংরক্ষণ, উন্নয়ন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই আহরণ ও উৎপাদনের লক্ষ্যে সরকার যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে।

বৈশ্বিক জলবায়ু বিপর্যয়ের জেরে সমসাময়িক বিশ্বের বিপুল জনগোষ্ঠী আজ সংকটাপন্ন। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। জার্মানওয়াচ কর্তৃক প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। জলবায়ু পরিবর্তনের বিধ্বংসী প্রভাবে যে ক্ষেত্রগুলো আক্রান্ত তার সম্মুখ সারিতে রয়েছে মৎস্য সেক্টর এবং মৎস্যজীবী সম্প্রদায়। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে টালমাটাল আজ এই জনগোষ্ঠী। জলবাযু পরিবর্তনের অভিঘাত লোনা পানির মৎস্যজীবী অথবা মিঠাপানির মৎস্যজীবী উভয়কেই আরও ক্ষয়িষ্ণু করে দিচ্ছে। এমনি করে নানান সংকটে মৎস্য খাতে বাংলাদেশ নিজেদের সাফল্য ধরে রেখেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। গত ২১ জুন সংসদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানার তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান। মন্ত্রী বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী দেশে মাথাপিছু দৈনিক ৬০ গ্রাম মাছের চাহিদা হিসেবে বার্ষিক চাহিদা দাঁড়ায় ৩৮.০৯ লাখ মেট্রিক টন। অথচ একই সময়ে দেশে মোট মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫১.১১ লাখ মেট্রিক টন, ফলে দেশে মাছের কোনো ঘাটতি নেই। তিনি আরো জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট মৎস্য উৎপাদনের তুলনায় আমদানীকৃত মাছের পরিমাণ মাত্র প্রায় ১ শতাংশ। এ সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির ৫৫ হাজার ৫৪ মেট্রিক টন মাছ আমদানি করা হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৪৭৫ কোটি টাকা।

মন্ত্রী বলেন, দেশে মাছের ঘাটতি নেই এবং সাধারণ ভোক্তার জন্য আমদানির প্রয়োজন হয় না। তবে বিশেষ ভোক্তা গোষ্ঠীর চাহিদা ও রুচি পূরণের জন্য সীমিত পরিসরে কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির মাছ আমদানি করা হয়।

তিনি জানান, আমদানীকৃত মাছের মধ্যে রয়েছে টুনা, হেরিং ফিশ, রূপচাঁদা, ম্যাকেরেল, ছুরি, স্ন্যাপার, কিং ফিশ, স্কুইড, অক্টোপাসসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রজাতি। মন্ত্রী আরো বলেন, দেশের মৎস্য খাতকে টেকসই ও উৎপাদনমুখী রাখতে সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন, গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে।