অনলাইন জুয়া দমনে নতুন আইন কার্যকর
দেশে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক জুয়ার বিস্তার রোধে নতুন আইন কার্যকর করেছে সরকার। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর বুধবার (১ জুলাই) ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬’ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয় এবং প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এটি কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত ‘প্রকাশ্য জুয়া আইন, ১৮৬৭’ আনুষ্ঠানিকভাবে রহিত হলো।
নতুন আইনে প্রথমবারের মতো অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল বেটিং, ফ্যান্টাসি বেটিং, ই-স্পোর্টস বেটিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, ঘোস্ট সিম, ভুয়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট, ম্যাচ ফিক্সিং এবং স্পট ফিক্সিংয়ের মতো বিষয়গুলোর সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রে গুগল এআই প্লাসের দাম কমল
আইন অনুযায়ী, ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ক্লাউড অবকাঠামো, ভিপিএন বা অন্য কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনা, বেটিং, জুয়ার জন্য অ্যাকাউন্ট খোলা বা ব্যবহার, কিংবা জুয়ার অর্থ জমা, উত্তোলন বা স্থানান্তর করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। বিদেশি অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি, এজেন্ট বা সহযোগী হিসেবেও কাজ করা যাবে না।
কোন অপরাধে কী শাস্তি?
আরও পড়ুন: হঠাৎ সার্ভার ডাউন ফেসবুক ও মেসেঞ্জার, ব্যবহারকারীদের লগআউট
নতুন আইনে বিভিন্ন অপরাধের জন্য পৃথক শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সাধারণ জুয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড অথবা ২ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড।
অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড অথবা ১ কোটি টাকা জরিমানা। অনলাইন বেটিং, বুকমেকার হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা, ভিপিএন বা মিরর সাইট ব্যবহার করে জুয়ার নেটওয়ার্ক পরিচালনায় সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা। ম্যাচ ফিক্সিংয়ে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানা।
স্পট ফিক্সিংয়ে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানা। ভুয়া সিম, ঘোস্ট সিম বা অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনায় সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানা।
সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে এ ধরনের অপরাধ করলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া আদালত দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অথবা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলা বা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবেন।
বিজ্ঞাপন ও প্রচারণাতেও শাস্তি
জুয়ার বিজ্ঞাপন, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা রেফারেল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে জুয়ার প্রচারে অংশ নিলে গণমাধ্যম, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী, খেলোয়াড় বা অন্য যে কেউ সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড অথবা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা, কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
অর্থপাচার ও সম্পদ জব্দের ক্ষমতা
আইনে জুয়ার অর্থ ব্যাংক, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, হাওলা, হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে স্থানান্তর বা বৈধ করার চেষ্টাকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর সম্পৃক্ত (Predicate Offence) অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া আদালত অপরাধে ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিম, মোবাইল ফোন, কম্পিউটারসহ সংশ্লিষ্ট সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিতে পারবেন। জুয়ার কাজে ব্যবহৃত ভবন, অফিস, কল সেন্টার বা সার্ভার অবকাঠামোও আদালতের আদেশে বাজেয়াপ্ত করা যাবে।
আইনে বলা হয়েছে, অনলাইন জুয়া ও সাইবার স্পেসে সংঘটিত অপরাধের বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে। এসব অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন (ডিপিআই), ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং সিস্টেম, ডেটা অ্যানালিটিক্স, জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট, এনআইডি-সিম-এমএফএস লিংকিং, বায়োমেট্রিক যাচাই এবং ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন জুয়া শনাক্ত ও প্রতিরোধের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
নতুন আইন বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), নির্বাচন কমিশন, সিআইডি এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সিসহ বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর জুয়ার বিস্তার রোধে এবং অর্থপাচার প্রতিরোধে নতুন আইনটি দেশের আইনগত কাঠামোকে সময়োপযোগী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সূত্র: বাসস





